পিআর সংবিধানে নেই, আমরা আইন বদলাতে পারি না
আইনি কাঠামো অপরিবর্তনীয়: নির্বাচনী সংস্কারের দাবি মেটাতে 'বর্তমান আইনেই সমাধান খুঁজতে হবে'
ঢাকা: একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের উপায় হিসেবে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation - PR) পদ্ধতির দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। কিন্তু নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এবং সাংবিধানিক আইন প্রণেতাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, বাংলাদেশের সংবিধানে বর্তমানে এই পদ্ধতির কোনো স্থান নেই এবং এর জন্য আইন বদলানোর কোনো ক্ষমতাই বর্তমান সরকারের নেই। ফলে, বিদ্যমান আইনি কাঠামোতেই নির্বাচনী সংস্কারের সমাধান খুঁজতে হচ্ছে।
সংবিধান বনাম রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা
বর্তমানে বাংলাদেশে 'ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট' (First-Past-the-Post - FPTP) বা আঞ্চলিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্বাচনের পদ্ধতি প্রচলিত। এই পদ্ধতিতে যে প্রার্থী তার নির্বাচনী এলাকায় অন্য সকলের চেয়ে বেশি ভোট পান, তিনিই নির্বাচিত হন। বহু বছর ধরে এই পদ্ধতিটি 'বিজয়ীরা সব নিয়ে যায়' নীতিকে উৎসাহিত করে আসছে এবং ক্ষুদ্র রাজনৈতিক দল ও সংখ্যালঘু ভোটারদের প্রতিনিধিত্বকে দুর্বল করেছে বলে সমালোচনা রয়েছে।
অন্যদিকে, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (PR) পদ্ধতিতে সংসদে দলগুলোর আসন তাদের প্রাপ্ত মোট ভোটের শতাংশের ভিত্তিতে বণ্টিত হয়, যা রাজনৈতিক বৈচিত্র্য এবং ব্যাপক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছু রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে এই PR পদ্ধতি চালুর দাবি উঠেছে।
আইনি বাধা ও প্রধান সমস্যা
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দাবি পূরণের পথে প্রধান বাধা হলো সংবিধানের মৌলিক কাঠামো।
১. সংবিধানের মৌলিকত্ব: বাংলাদেশের সংবিধানে সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য সরাসরি নির্বাচন এবং আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বের (Direct election and territorial representation) নীতিকে মৌলিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। PR পদ্ধতি চালু করতে গেলে এই মৌলিক সাংবিধানিক কাঠামোতে হাত দিতে হবে, যা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি অসাধ্য কাজ।
২. ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা: আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের মতো অ-নির্বাচিত সরকারের সংবিধান সংশোধনের কোনো ম্যান্ডেট বা ক্ষমতা নেই। কেবল জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদই দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানে পরিবর্তন আনতে পারে।
৩. নির্বাচন কমিশনের অবস্থান: প্রধান নির্বাচন কমিশনার (CEC) সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বারবার স্পষ্ট করেছে যে, জনগণের প্রতিনিধিত্ব আইন (RPO) এবং সংবিধানের বর্তমান বিধান অনুযায়ী, PR পদ্ধতি গ্রহণ করা আইনত সম্ভব নয়। আইনি পরিবর্তন ছাড়া এই পথে এগোনো হলে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া অবৈধ হয়ে যেতে পারে।
সমাধান: বিদ্যমান কাঠামোর ভেতরে সংস্কার
যদি সংবিধান বদলানো না যায়, তবে নির্বাচনী সংস্কারের দাবি পূরণের বিকল্প কী? বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিদ্যমান FPTP পদ্ধতির ভেতরেই বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব।
- নির্বাচনী সীমানা পুনঃনির্ধারণ (Delimitation): সীমানা নির্ধারণকে আরও নিরপেক্ষ ও ন্যায্য করে তোলা।
- ভোটের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি: ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (EVM) বা অন্য কোনো প্রযুক্তির ব্যবহার, যা জাল ভোট ও কারচুপি প্রতিরোধে কার্যকর।
- নির্বাচনী বিধিমালা কঠোর করা: নির্বাচনকালীন আচরণবিধি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা করা।
আইনবিদদের মতে, সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে, বর্তমান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO)-এর কিছু ধারা সংশোধন করে নির্বাচনের মান এবং জনগণের আস্থার জায়গা বাড়ানো যেতে পারে। আপাতত, এই 'আইনি সীমাবদ্ধতা' মেনেই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে, যা সংবিধানে হস্তক্ষেপ না করেও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে।
আপনার কি মনে হয়, বর্তমান আইন মেনেই নির্বাচনী ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা সম্ভব?