ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে প্রথমবার স্লোভেনিয়া ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ফিলিস্তিনে আগ্রাসন ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে এই কঠোর পদক্ষেপ নেয় দেশটি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইতিহাসে নজিরবিহীন পদক্ষেপ হিসেবে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে স্লোভেনিয়া। বৃহস্পতিবার থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আগস্ট মাসেই স্লোভেনিয়া ইসরাইলের ওপর অস্ত্র রপ্তানি নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেয়, এবং এর মাধ্যমে দেশটি প্রথম ইউরোপীয় সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে এই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এরও আগে তারা ইসরাইলি দুই বিতর্কিত মন্ত্রী—ইতামার বেন গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচকে ‘অবাঞ্ছিত ব্যক্তি’ ঘোষণা করেছিল। ওই দুই মন্ত্রী প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যামূলক বক্তব্য’ দেওয়ার কারণে স্লোভেনিয়া এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল।
শুধু তাই নয়, ২০২৪ সালের জুন মাসে স্লোভেনিয়া নরওয়ে, স্পেন ও আয়ারল্যান্ডের মতো দেশগুলোর পথ অনুসরণ করে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই সময় থেকে দেশটি ধারাবাহিকভাবে গাজায় ইসরাইলি সামরিক আগ্রাসনের তীব্র সমালোচনা করে আসছে। প্রেসিডেন্ট নাতাশা পির্ক মুসার প্রকাশ্যে ইসরাইলি হামলাকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া এক আবেগঘন ভাষণে মুসার বলেন, “আমাদের এখন সঠিক কাজটি করতেই হবে। আমরা হলোকাস্ট ঠেকাতে পারিনি, আমরা রুয়ান্ডার গণহত্যা ঠেকাতে পারিনি, আমরা স্রেব্রেনিৎসার হত্যাযজ্ঞ ঠেকাতে পারিনি। কিন্তু গাজার গণহত্যা আমরা অবশ্যই ঠেকাতে হবে। আর কোনো অজুহাত দেওয়ার সময় নেই।”
ইসরাইলি আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামলা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৫ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য প্রকাশ করেছে। পুরো গাজা উপত্যকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং দুর্ভিক্ষ এখন জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে, আন্তর্জাতিক আদালতগুলোতেও ইসরাইলি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। গত নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োযভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতেও (আইসিজে) গাজায় গণহত্যার অভিযোগে ইসরাইলের বিরুদ্ধে মামলা চলছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্লেষকরা বলছেন, স্লোভেনিয়ার এই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা শুধু প্রতীকী নয়; এটি ইউরোপীয় কূটনীতির এক নতুন ধাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইসরাইলকে চাপের মুখে ফেলতে ইউরোপের আরও দেশ একই পথে হাঁটতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
স্লোভেনিয়ার এই সাহসী সিদ্ধান্ত বিশ্ব রাজনীতিতে ইসরাইলি নীতির বিরুদ্ধে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। অনেকেই বলছেন, মানবাধিকার রক্ষার নামে নেওয়া এই পদক্ষেপ গাজায় অবসানহীন রক্তপাত থামাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে, ইসরাইলি সরকার ইতিমধ্যে এ নিষেধাজ্ঞাকে “রাজনৈতিক প্রহসন” বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক রাজনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলছে। মানবাধিকারকর্মীরা আশা করছেন, আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ার ফলে ফিলিস্তিনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।