‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’—বিখ্যাত কবি দাউদ হায়দারের কবিতার এই লাইনটি যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে ফরিদপুরের নগরকান্দার তরুণ জসিম মাতুব্বরের জীবনে। জন্ম থেকেই দুই হাতবিহীন এই মেধাবী যুবক অবিরাম সংগ্রাম করে এগিয়ে যাচ্ছেন জীবনে। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করেও তিনি হেরে যাচ্ছেন নাগরিক সেবার দৌড়ে—কারণ, আঙুলের ছাপ দিতে না পারায় পাচ্ছেন না জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)। আর এই একটি পরিচয়পত্র না থাকায় সরকারি-বেসরকারি সব সেবার দরজা তার জন্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার তামলা ইউনিয়নের কদমতলী গ্রামের দরিদ্র পরিবারে জন্ম জসিমের। বাবা হানিফ মাতুব্বর আর মা তসিরণ বেগমের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি বড়। জন্ম থেকেই দুই হাত না থাকলেও থেমে যাননি তিনি। অসম্ভব ধৈর্য আর দৃঢ় মনোবল নিয়ে পা দিয়ে লিখতে শিখেছেন। সেই পা দিয়েই তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছেন কৃতিত্বের সাথে। বর্তমানে তিনি ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।
কেবল পড়াশোনা নয়, সংসারের অভাব মেটাতে জসিম বিভিন্ন সময় ব্যবসাও করেন। কখনো ফল বিক্রি, কখনো আবার সবজি বা কাঁচামালের ব্যবসা করে সংসার চালান। তার এই অদম্য প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৬ সালে একটি ভ্যানগাড়ি ও ২০২২ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা পুরস্কার পান তিনি। এই সহায়তাগুলো তার জীবনের পথে এগিয়ে যেতে সহায়ক হয়।
তবে সব অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে একটিমাত্র প্রতিবন্ধকতা—জাতীয় পরিচয়পত্র না পাওয়া। তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে জসিম ছুটে বেড়াচ্ছেন নির্বাচন কমিশনের অফিসে। কিন্তু প্রতিবারই ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। তার বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র আছে, জন্ম নিবন্ধনও রয়েছে। কিন্তু হাতে আঙুলের ছাপ দিতে না পারায় তার আবেদন কার্যকর হচ্ছে না।
জসিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার দুটি হাত নেই, কিন্তু আমি পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি। পা দিয়ে লিখে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেছি। এখন কলেজে পড়ছি। অনেক সরকারি-বেসরকারি সেবা নিতে গেলে এনআইডি লাগে। কিন্তু হাত না থাকায় আঙুলের ছাপ দিতে পারি না, তাই পরিচয়পত্র পাচ্ছি না। ২০২৩ সাল থেকে চেষ্টা করছি, অনলাইনে আবেদনও করেছি, কিন্তু কিছুই হয়নি।”
তিনি আরও জানান, “প্রতিদিন অভাবের সংসারে হাটে সবজি বিক্রি করি। সেই আয়ে পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চলে। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। অনেক সময় লজ্জাজনক অবস্থায় পড়তে হয়।
এ বিষয়ে নগরকান্দা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) শাওন সাগর বলেন, “আমি সম্প্রতি যোগদান করেছি। যেহেতু ছেলেটির বিশেষ শারীরিক সমস্যা আছে, আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো যাতে তাকে এনআইডি প্রদান করা যায়।
জসিম মাতুব্বরের মতো হাজারো প্রতিবন্ধী নাগরিক দেশে প্রতিনিয়ত এ ধরনের সমস্যায় পড়ছেন। অথচ রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সবার জন্য সমান নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা। প্রযুক্তি আর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় ঘটাতে পারলেই জসিমদের মতো মানুষগুলো স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পাবে।
জন্ম থেকেই অসম্পূর্ণ শারীরিক গঠন, কিন্তু অদম্য মনোবল—এটাই জসিমের জীবনগল্প। তার দাবি খুবই সাধারণ—“আমি শুধু একজন সাধারণ নাগরিকের মতো জাতীয় পরিচয়পত্র চাই।