উজানের ঢল ও ভারী বর্ষণে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে টানা প্রবাহিত হচ্ছে। নীলফামারী ও লালমনিরহাটের অন্তত ৪৫ গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি, তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি।
উজানের পাহাড়ি ঢল এবং কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণে তিস্তা নদীর পানি আবারও বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) সকাল ৯টায় নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ডালিয়া পয়েন্টে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বিপৎসীমার ৫২ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটারের থেকে ১৫ সেন্টিমিটার ওপরে পানির প্রবাহ রেকর্ড করে।
এর আগে বুধবার সকালে পানি প্রথমে বিপৎসীমা অতিক্রম করে ৭ সেন্টিমিটার ওপরে উঠে যায়, পরে কিছুটা কমে ৪ সেন্টিমিটারে নামে। কিন্তু রাতের ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে ভোরের দিকে তা দ্রুত বেড়ে ১১ সেন্টিমিটার ওপরে পৌঁছে যায়।
টানা ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বিপৎসীমার ওপরে পানি প্রবাহিত হওয়ায় নীলফামারী ও লালমনিরহাটের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অন্তত ৪৫টি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে রোপা আমনসহ বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মাছের ঘের ও গবাদিপশুর খাদ্যসংস্থান।
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই, পশ্চিম ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, গয়াবাড়ী, খালিশা চাপানী ও ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের অন্তত ১৫টি গ্রাম এবং লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলার বহু চরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে গড্ডিমারী, দোয়ানী, ছয়আনী, সানিয়াজান, সিঙ্গামারি, সিন্দুর্না, হলদিবাড়ী, ডাউয়াবাড়ী, কালীগঞ্জের ভোটমারী, শৈইলমারী, নোহালী, আদিতমারীর মহিষখোচা, গোবর্ধন, কালমাটি, বাহাদুরপাড়া, পলাশী এবং সদর উপজেলার ফলিমারী, খুনিয়াগাছ, কুলাঘাট, মোগলহাট, রাজপুর, বড়বাড়ী ও গোকুন্ডা ইউনিয়নে পানি ঢুকেছে।আদিতমারীর গোবর্ধন গ্রামের মতিয়ার রহমান বলেন, "সাত দিন ধরে পানির মধ্যে আছি, রান্না করতে পারিনি। গরু-ছাগল ও পরিবারের সদস্যদের উঁচু জায়গায় রেখেছি। সাহায্যের চেয়ে চাই, যেন আর পানি না আসে।"
পানিবন্দি মর্জিনা বেগম জানান, "গরু-ছাগলের খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছি। ১০ কেজি চাল পেয়েছি, কিন্তু এটা কোনো সমাধান নয়। আমরা চাই স্থায়ী সমাধান।"
খুনিয়াগাছ ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল আলীম বলেন, "প্রতিবার বন্যায় ধান, পাট, মাছ সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া মুক্তি নেই।
ডিমলার পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ খান জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে পানির প্রবাহ বেড়ে ইউনিয়নের ঝাড়সিংহেরস্বর, খোকার চর, খাড়াপাড়া, ফ্লাটপাড়া সহ বিভিন্ন চরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম বলেন, নদীর কয়েকটি চ্যানেল বের হয়ে পূর্বখড়িবাড়ী মৌজার বহু আবাদি জমি তলিয়ে গেছে। স্থানীয়দের স্বেচ্ছাশ্রমে চ্যানেল বন্ধের কাজ চলছে এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড সহায়তা দিচ্ছে। ইতিমধ্যেই চরাঞ্চলের দুই শতাধিক পরিবারের ঘরে পানি ঢুকেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, আগামী দুই দিন এই অঞ্চলে ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকতে পারে। এতে লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, “পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তিস্তা ব্যারাজের সব ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে।”
চলতি মৌসুমে এটি তিস্তায় তৃতীয় দফা বন্যা। জুলাইয়ের ২৯ তারিখে প্রথম দফায় এবং ৩ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছিল। এবার ১৩ আগস্ট থেকে বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে এবং বিপদের আশঙ্কা এখনও কাটেনি।