দায়হীন দ্বৈত শাসনে দিশেহারা প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

দায়হীন দ্বৈত শাসনে দিশেহারা প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা

Samudra Sen Sharma avatar   
Samudra Sen Sharma
দায়হীন দ্বৈত শাসনে দিশেহারা প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা
দায়হীন দ্বৈত শাসনে দিশেহারা প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা
ছবি: সংগৃহীত
গত আড়াই মাস থেকে ক্লাশ পরিক্ষা বন্ধ করে আন্দোলন করছেন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থীরা । দাবি মানা না হলে বসবেন অনশনে ।..

বাংলাদেশের তিনটি সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ময়মনসিংহ (MEC), ফরিদপুর (FEC) ও বরিশাল (BEC) বর্তমানে এক গভীর সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই তিন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা গত দুই মাস ধরে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। দাবি তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে স্বাধীনতা দিয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (BIT)-এর আদলে পুনর্গঠন করতে হবে।

 

বর্তমানে এই তিনটি কলেজ প্রশাসনিকভাবে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হলেও একাডেমিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  অধিভুক্ত। অথচ এই ‘দৈত শাসন’ কাঠামোতে ঢাবি শুধু সিলেবাস প্রনয়ন আর সেমিস্টার ফাইনাল পরিক্ষার প্রশ্ন মডারেশন করেই দায় মুক্ত হচ্ছে ।  অন্যদিকে কারিগরি অধিদপ্তর বলছে, একাডেমিক দায়িত্ব তো ঢাবির তারা শুধু অবকাঠামো ও প্রশাসনিক বিষয়ে নিয়োজিত।

ফলে, একদিকে শিক্ষার্থীরা সময়মতো ক্লাস ও পরীক্ষা পাচ্ছেন না, অন্যদিকে শিক্ষক সংকট, অনুদান ঘাটতি, আধুনিক ল্যাব ও গবেষণা সুবিধার অভাব সব মিলিয়ে প্রকৌশল শিক্ষার মানে ভয়াবহ অবনতি ঘটছে।

গত ২০ মে, ২০২৫। ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ৪র্থ বর্ষের মেধাবী ছাত্র ধ্রুবজিত বিশ্বাস বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যাবস্থাকে দায়ী করে আত্নহত্যা করেন । এই আত্মহননের ঘটনা আন্দোলনের সুত্রপাত ঘটায় । MEC, FEC ও BEC-এর শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেন এবং প্রাথমিক ভাবে একাডেমিক কম্বাইন্ড সিস্টেমকে পরিবর্তনের জন্য দাবি জানালেও এই আন্দোলোনই পরবর্তিতে BIT এর আদলে সতন্ত্র প্রতিষ্ঠান গঠনের আন্দোলনের রূপ নেয় । 

বাংলাদেশে ১৯৮৬ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত BIT (বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি) নামে চারটি স্বশাসিত প্রকৌশল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল চট্টগ্রামে, খুলনায়, রাজশাহীতে এবং গাজীপুরে। এসব প্রতিষ্ঠান পরবর্তীতে রূপান্তরিত হয় যথাক্রমে চুয়েট, কুয়েট, রুয়েট ও ডুয়েট-এ। এই BIT মডেলে ছিল একাডেমিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা, স্বচ্ছ শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি, এবং নিজস্ব একাডেমিক কাউন্সিল।

বর্তমানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি SEC , MEC, FEC ও BEC-কে সেই পুরনো BIT মডেলে ফিরিয়ে আনতে হবে, যেন তারা ঢাবি ও কারিগরির অধিনে জিম্মি না থেকে একটি সতন্ত্র একাডেমিক কাঠামোতে মানসম্মত প্রকৌশল শিক্ষা লাভ করতে পারে।

এই দাবির প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, শিক্ষা সচিব এবং ঢাবির প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিনের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। সকলেই একবাক্যে স্বীকার করেন “দাবি যৌক্তিক।” কিন্তু একই সঙ্গে বলেন “এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।”

২ মাস নিজ নিজ কলেজে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের পর শিক্ষার্থীরা ২৭ জুলাই ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। ঐ দিন শিক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকেও একই উত্তর পান “দাবি যৌক্তিক কিন্তু  সমাধান সম্ভব না।”

বৈঠকে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন তোলেন “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজ যখন পৃথক কেন্দ্রীয় ইউনিট হিসেবে কাজ করতে পারে, তখন প্রকৌশল কলেজগুলো কেন পারবে না?”উত্তরে উপদেষ্টা জানান,“সাত কলেজ ছিল একটি বিগ ইস্যু, অর্থাৎ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ভঙ্গুর ব্যাবস্থাকে সংস্কারের দাবিকে সরকার বিগ ইস্যু মনে করে না । 

৩১ জুলাই, ঢাবির মধুর ক্যান্টিনে এক জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে শিক্ষার্থীরা ঘোষণা দেন সরকারের কাছে ৯ দিনের আল্টিমেটাম। এই সময়ের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নের কার্যকর উদ্যোগ না নিলে তারা আগামি ১০ আগস্ট থেকে আমরণ অনশন শুরু করবেন। 

শিক্ষার্থীরা আর চায় না অনিশ্চয়তা, সেশনজট আর আত্মহননের প্রান্তিক পরিস্থিতি। তারা চায় একটি নির্ভরযোগ্য, আধুনিক, গবেষণাভিত্তিক প্রকৌশল শিক্ষা ব্যবস্থা। সরকারের উচিত, এই শান্তিপূর্ণ ও যৌক্তিক আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।

প্রশ্ন একটাই আর কত ধ্রুবজিত মৃত্যুর পরে আমরা বুঝব, এই সংকট আসলেই “বিগ ইস্যু”?

 

সমুদ্র সেন শর্মা
১ম বর্ষ
পুরকৌশল বিভাগ
বরিশাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ 

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator