মাইলস্টোন স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী রাইসার লাশ যখন গ্রামে আসে, কান্নায় ভেঙে পড়ে গ্রামের মানুষ। জানাজা ও দাফনের পরও পুরো এলাকা জুড়ে নেমে আসে শোকের নীরবতা।
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার বাজড়া গ্রামের বাতাস ছিল ভারী—শুধু কান্নায় নয়, শোক, হাহাকার আর এক অপূরণীয় শূন্যতায়। শুক্রবার ভোরে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছোট্ট ছাত্রী রাইসা মনির লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স যখন তার পিতৃভূমিতে এসে পৌঁছায়, তখন গ্রামজুড়ে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। মুহূর্তেই জড়ো হয় শত শত মানুষ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। কেউ লাশ দেখতে পেয়ে মূর্ছা যান, কেউ আবার শুধুই ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকেন।
কেউ রাইসাকে দেখতে পায়নি—তবুও হৃদয়ে তার সেই নিষ্পাপ মুখ ভেসে উঠেছে। গ্রামের নারীদের হাউমাউ কান্না ছুঁয়ে যায় সবাইকে। সকাল ৯টায় গোপালপুর ইউনিয়নের বাজড়া ঈদগাহ মাঠে জানাজা হয়। সেখানে হাজির ছিলেন নানা বয়সের শত শত মানুষ। পরে রাইসাকে চিরশায়িত করা হয় বাজড়া কবরস্থানে। জানাজা শেষে ফেরে না কেউ—ফিরে আসে না সেই রাইসাও।
রাইসা মনির জন্ম এক স্বপ্নের মধ্য দিয়ে। বাবা শাহাবুল শেখ ও মা মিম দম্পতির ইচ্ছে ছিল, মেয়েকে বড় করে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে মানুষ বানাবেন। উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি করেছিলেন রাইসাকে। সে ছিল তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বড় বোন সিনথিয়া পড়ছে অষ্টম শ্রেণিতে। ভাই রাফসান মাত্র ৪ বছর বয়সী।
রাইসার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, গোটা গ্রামের বুকে রক্তাক্ত ছাপ রেখে গেছে। সাবেক ইউপি সদস্য ওবায়দুর রহমান বলেন, “রাইসার মরদেহ যখন বাড়িতে আসে, গ্রামের মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়ে। এমন কোনো পরিবার নেই যারা এই মেয়েটির জন্য চোখের পানি ফেলেনি।”
সবচেয়ে ভাঙাচোরা এখন রাইসার বাবা শাহাবুল শেখ। কণ্ঠে কান্না জড়ানো অবস্থায় বলেন, “বাবা ছুটির পর তুমি আমাকে নিতে এসো—এই ছিল আমার মেয়ের শেষ কথা। আমি স্কুলে গিয়েছিলাম, কিন্তু মেয়েকে আর পাইনি। শেষবারের মতো আমার কলিজার টুকরাকে দেখতে পেলাম না।”
তিনি আরও বলেন, “আমার বড় মেয়েটাও এখন ভয় পায়। সে আর স্কুলে যেতে চায় না। বলে—যদি আবার বিমান ভেঙ্গে পড়ে? আমি এক মেয়ে হারিয়েছি, আরেকটিকে হারাতে চাই না।”
২১ জুলাই বিমান দুর্ঘটনায় নিহত রাইসাকে শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। ২২ জুলাই সিআইডির ডিএনএ ল্যাব সদস্যরা নমুনা সংগ্রহ করেন। পরীক্ষার পর নিশ্চিত হয়ে পরিবারের কাছে তার মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।
রাইসা শুধু আরেকটি নাম নয়, সে হয়ে উঠেছে এক ব্যথার প্রতিচ্ছবি—একটি স্বপ্নভঙ্গের নাম। তার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে গোটা বাজড়া গ্রামের মানুষ যেন চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে—ভবিষ্যতের আশঙ্কা আর অতীতের না বলা গল্পগুলো নিয়ে।