মালয়েশিয়ার পুলিশ সম্প্রতি একটি বড়ো সন্ত্রাসবাদের আঁতুড়ঘর ভাঙচুর করেছে, যেখানে ৩৫ জন বাংলাদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে চরমপন্থী উগ্র মতবাদ প্রচার এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আইএসের সঙ্গে অর্থায়ন ও সম্পর্ক থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। বিষয়টি প্রথম প্রকাশ করেছেন কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল-জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের, যিনি ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন।
গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের তালিকায় উল্লেখ রয়েছে পারভেজ মাহমুদ পাবেল, শরীফ উদ্দিন, রোহমান মোহাম্মদ হাবিবুর, সালেহ আহমেদ সহ আরো কয়েক দশক নাম। তদন্তে জানা গেছে, তাদের মধ্যে ১৪ জন অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় বসবাস করছিলেন, যাদেরকে ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং নিরাপত্তা সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রাখা হয়েছে।
মালয়েশিয়া পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের কাউন্টার টেররিজম ডিভিশনের প্রধান এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, গ্রেপ্তারকৃত চক্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আইএস মতাদর্শ প্রচার করত এবং আন্তর্জাতিক মানি ট্রান্সফার ও ই-ওয়ালেট ব্যবহারের মাধ্যমে সিরিয়া ও বাংলাদেশে অর্থ পাঠাত। এই অর্থ সংগ্রহের প্রমাণ পুলিশ পেয়েছে, তবে কত টাকা সংগৃহীত হয়েছে তা এখনও তদন্তাধীন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রিভেনশন অব টেররিজম অ্যাক্টের আওতায় চার্জ গঠন করা হয়েছে এবং বাকি সদস্যদের ব্যাপক তদন্ত চলছে। মালয়েশিয়া পুলিশের বরাতে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ‘গেরাকান মিলিটান রেডিক্যাল বাংলাদেশ’ (জিএমআরবি) নামে একটি চক্র এই সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করত, যেটি হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে সদস্য সংগ্রহ ও উগ্র মতবাদ ছড়াত।
এই গ্রেপ্তারের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার পুলিশ দেশের শ্রমিক সমাজের মধ্যে আইএস-এর মতাদর্শ ছড়ানোর এক বড়ো চক্র ভেঙে দিয়েছে। বিষয়টি কেবল মালয়েশিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাংলাদেশ ও সিরিয়ার সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অর্থায়নেও এটি একটি বড়ো ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মালয়েশিয়ার নিরাপত্তা সংস্থা মনে করছে, এই ধরণের চরমপন্থী কার্যক্রম রুখতে তাদের আরও সক্রিয় হতে হবে।
তদন্তের পর খতিয়ে দেখা হচ্ছে গ্রেপ্তারকৃতরা কীভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে উগ্রবাদ ছড়াত। সদস্যদের কাছ থেকে সংগৃহীত ফি এবং চাঁদার মাধ্যমে এই চক্র আন্তর্জাতিক অর্থ পাচার করত, যা আইএস-এর মত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর জন্য ব্যয় করা হতো।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নেওয়া হয়েছে। দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো মালয়েশিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করে বাকি ব্যক্তিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে সঠিক তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন সন্ত্রাসী কার্যক্রম রোধে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার যৌথ প্রচেষ্টা আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
গ্রেপ্তারদের মধ্যে যারা অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় ছিলেন, তাদের দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, বিশেষ করে ইমিগ্রেশন পুলিশ ও কাস্টমস একসাথে কাজ করছে। ফেরত আসা বাংলাদেশিরা দেশে ফিরে নিরাপত্তা সংস্থার নজরদারিতে রাখা হচ্ছে, যেন তারা কোনো উগ্রপন্থায় না পতিত হন।
মালয়েশিয়ায় এই গ্রেপ্তারের ঘটনা শুধু মালয়েশিয়ার সুরক্ষার জন্য নয়, দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। দেশের সীমান্ত ও অভিবাসন নীতিমালা আরও কড়া করা প্রয়োজন, যাতে বিদেশী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এভাবে দেশীয় নাগরিকদের ব্যবহার করতে না পারে।
বাংলাদেশের সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীকে উচিত মালয়েশিয়ার সঙ্গে যৌথ অভিযানে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেয়া এবং প্রতিটি দিক থেকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করা। আইএসের মত আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণে এ ধরনের সহযোগিতা দেশ এবং জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।