মেহেরপুর শহরে দিনের আলোয় হঠাৎ যেন নেমে এল বজ্রপাত। শহরের ব্যস্ত জনপদের মাঝেই গড়ে উঠেছিল একটি গোপন হেরোইন আখড়া—যা এতদিন লোকচক্ষুর আড়ালে থাকলেও শনিবার সকালে যৌথ অভিযানে তা প্রকাশ্যে চলে আসে। সেনাবাহিনী ও জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সমন্বিত এক ঝটিকা অভিযানে মেহেরপুর শহরের মিয়া পাড়া থেকে ১৩০ গ্রাম হেরোইনসহ আটক করা হয় এক নারী ও তার ছেলেকে।
আটক হওয়া শিখা খাতুন (৪৫) দীর্ঘদিন ধরে এলাকার একজন নিরীহ গৃহিণী হিসেবে পরিচিত থাকলেও, তদন্তে উঠে আসে তার বিপরীত এক চেহারা। তিনি মিয়া পাড়ার নুরুন্নবীর স্ত্রী। আর তার ছেলে জাহিদ (২৫) স্থানীয়ভাবে পরিচিত ছিলেন মোটরসাইকেল মেকানিক হিসেবে। কিন্তু পর্দার আড়ালে চলছিল তাদের ভয়ঙ্কর মাদক কারবার।
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক বিদ্যুৎ বিহারী নাথ জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শনিবার সকালেই অভিযানে নামে সেনাবাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ টিম। টার্গেট ছিল শিখা খাতুনের বাড়ি। অভিযান চালিয়ে ঘর থেকে উদ্ধার করা হয় ১৩০ গ্রাম হেরোইন, নগদ ৬২ হাজার ৮৩০ টাকা এবং মাদক বিক্রির নানা সরঞ্জাম।
এই পরিমাণ হেরোইনের মূল্য কালোবাজারে কয়েক লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায় বলে জানা যায়। শুধু তাই নয়, বাড়ির ভেতরে এমনভাবে হেরোইন লুকানো ছিল যে তা না জানলে খুঁজে পাওয়াই কঠিন হতো। তদন্তকারীরা বলছেন, মা-ছেলের এই মাদক ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরেই গোপনে পরিচালিত হচ্ছিল, এবং তাদের পেছনে আরও বড় চক্র থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শিখা খাতুন ও তার ছেলে জাহিদ হেরোইন বিক্রির সঙ্গে নিজেদের জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছে বলে জানান পরিদর্শক। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, পারিবারিক টানাপোড়েন ও আর্থিক অনটনের কারণেই তারা প্রথমে ছোট পরিসরে এই ব্যবসা শুরু করে। তবে কিছুদিনের মধ্যেই এই 'ব্যবসা' রূপ নেয় পুরো এলাকার জন্য এক ভয়ঙ্কর ফাঁদে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আওতায় অভিযান অব্যাহত থাকবে। মেহেরপুর সদর থানায় তাদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা এই ঘটনায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা জানান, শিখা খাতুন দীর্ঘদিন ধরেই “সন্দেহজনক” ছিল, কিন্তু প্রমাণের অভাবে কেউ কিছু বলতে পারেনি। এখন প্রশাসনের এই সফল অভিযানকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অনেকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই ঘটনাকে ঘিরে চলছে তীব্র আলোচনা। অনেকেই বলছেন, “যেখানে মায়েরা সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য লড়াই করে, সেখানে একজন মা-ই সন্তানকে নিয়ে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন—এটা সমাজের জন্য একটি ভয়ঙ্কর সংকেত।”
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এই ঘটনার পেছনে থাকা বড় চক্রটি খুঁজে বের করতে আরও তদন্ত অব্যাহত থাকবে এবং মেহেরপুরে মাদকের বিরুদ্ধে আরও জোরালো অভিযান চালানো হবে।
এই ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হলো—মাদক যে কোনো পরিচয়ের মানুষকে অন্ধকারে নিয়ে যেতে পারে। মা-ছেলে যখন মাদক ব্যবসায় জড়ায়, তখন বিষয়টি শুধু আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি এক সামাজিক ও নৈতিক বিপর্যয়ের দিকেও ইঙ্গিত দেয়।