৫জি: বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ ও ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ

কামরুল হাসান  avatar   
কামরুল হাসান
৫জি: বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ ও ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ
৫জি: বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ ও ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) গত বছর ৫জি স্পেকট্রাম নিলাম থেকে প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব অর্জন করলেও, দেশের টেলিকম অপারেটরদের ৫জি অবক...

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) গত বছর ৫জি স্পেকট্রাম নিলাম থেকে প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব অর্জন করলেও, দেশের টেলিকম অপারেটরদের ৫জি অবকাঠামোতে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগের গতি এখনও শ্লথ। এই পরিস্থিতি ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবাচ্ছে, যেখানে উচ্চগতির ৫জি সংযোগ একটি মৌলিক চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত। বিশেষত, বিটিআরসি কর্তৃক নির্ধারিত স্পেকট্রাম মূল্য এবং লাইসেন্সিং শর্তাবলী বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জগুলোকে আরও প্রকট করে তুলেছে, যা দেশের সামগ্রিক ডিজিটাল রূপান্তর প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলছে।

৫জি প্রযুক্তির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শুধু স্পেকট্রাম বরাদ্দই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন গ্রাউন্ড-আপ অবকাঠামো নির্মাণ ও বিদ্যমান ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ। অপারেটররা এই মুহূর্তে যে প্রধান চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো বিপুল পরিমাণ মূলধনী বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা। একটি কার্যকর ৫জি নেটওয়ার্ক স্থাপনে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ঘন ফাইবার অপটিক কেবল স্থাপন, অসংখ্য ছোট সেল টাওয়ার (স্মল সেল) স্থাপন এবং আধুনিক ডেটা সেন্টার নির্মাণ আবশ্যক। বাংলাদেশের ভূখণ্ডগত বৈশিষ্ট্য এবং ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে এই ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। উপরন্তু, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং স্থানীয় বাজারে টেলিকম সেবার মূল্য হ্রাসের চাপ অপারেটরদের নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধাগ্রস্ত করছে। উদাহরণস্বরূপ, ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের অপ্রতুলতা স্মার্ট সিটি, IoT (ইন্টারনেট অফ থিংস) এবং অত্যাধুনিক শিল্প অ্যাপ্লিকেশনগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় লো-ল্যাটেন্সি ও হাই-ব্যান্ডউইথের সেবা প্রদানে অন্তরায় সৃষ্টি করছে, যা ডিজিটাল অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।

ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে ৫জি-এর ভূমিকা অনস্বীকার্য, কারণ এটি শুধুমাত্র দ্রুত ইন্টারনেট নয়, বরং নতুন শিল্প, যেমন স্বয়ংক্রিয় যান, দূরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা, অগমেন্টেড ও ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (AR/VR) এবং স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের জন্য প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে। তবে, বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জগুলো এই সম্ভাবনার পথ রুদ্ধ করছে। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) এবং অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ডিজিটাল রূপান্তরে ভূমিকা রাখলেও, ৫জি অবকাঠামোর ঘাটতি তাদের উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলোকে পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছে। ৫জি-এর জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চ ক্ষমতার চিপসেট এবং নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম আমদানি ব্যয়ও একটি বড় কারণ। এছাড়াও, বিদ্যুৎ সরবরাহ, সাইট অ্যাকুইজিশন এবং স্থানীয় প্রশাসনিক জটিলতাও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে না পারলে, সরকার কর্তৃক নির্ধারিত 'স্মার্ট বাংলাদেশ' ২০৪১ এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ধীরগতি আসতে পারে, যেখানে ৫জি একটি মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে কাজ করার কথা।

খাত ২০২২ সালে বিনিয়োগ (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ২০২৭ সালের পূর্বাভাসিত বিনিয়োগ (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বর্ধন হার (CAGR)
৫জি অবকাঠামো ১.৫ ৬.৮ ৩৫.২%
ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক ০.৮ ২.৫ ২৫.৭%
ডেটা সেন্টার ০.৬ ১.৯ ২৬.০%

উৎস: টেলিকম অ্যানালিটিক্স রিপোর্ট, ২০২৪

সুপারিশ

  • বিটিআরসিকে ৫জি স্পেকট্রাম বরাদ্দ এবং লাইসেন্সিং ফি কাঠামো পুনর্বিবেচনা করতে হবে, যাতে অপারেটরদের উপর আর্থিক চাপ কমে এবং তারা অবকাঠামোতে বিনিয়োগে উৎসাহিত হয়। এর সাথে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করা যেতে পারে।
  • সরকারকে, বিশেষত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং এটুআই (a2i) এর মাধ্যমে, ৫জি অবকাঠামোতে বিনিয়োগের জন্য পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেলের অধীনে আর্থিক প্রণোদনা, যেমন শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদী, স্বল্প সুদের ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) যৌথভাবে একটি দ্রুত ও সমন্বিত সাইট অ্যাকুইজিশন নীতি প্রণয়ন করবে, যা অপারেটরদের জন্য ৫জি টাওয়ার এবং ফাইবার স্থাপন প্রক্রিয়াকে সহজ করবে এবং স্থানীয় প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কামরুল হাসান

কামরুল হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: টেলিকম, ৫জি ও ইন্টারনেট অবকাঠামো। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator