বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘকাল ধরে দুর্নীতি ও অনিয়মের এক গভীর জালে আবদ্ধ। চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটা থেকে শুরু করে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই অনিয়মের অভিযোগ এখন সাধারণ ঘটনা। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর একাধিক প্রতিবেদনে এই খাতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। এমনকি বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও স্বীকার করেছেন যে, বিগত অপশাসনের কারণে দেশের স্বাস্থ্য খাত দুর্নীতিতে নিমজ্জিত এবং জনগণের অর্থসম্পদ লুটপাট ও অপচয় হয়েছে। এই সীমাহীন দুর্নীতি একদিকে যেমন সরকারি অর্থের অপচয় ঘটাচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অধিকারকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় অনিয়ম। একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এই কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করছে, যারা সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। নিরীক্ষা বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোভিডকালে (২০১৯-২০ অর্থবছরে) শুধু রাজধানীর কয়েকটি সরকারি হাসপাতালেই বিভিন্ন সরঞ্জাম ও সেবা কেনায় ২৯ কোটি ৯৩ লাখ ৬৮ হাজার ৯৬৯ টাকার আর্থিক অনিয়ম হয়েছে, যেখানে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) লঙ্ঘন করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কুয়েত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল প্রতিটি ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা দামে ইসিজি মেশিন কিনেছে, যার বাজার দর ছিল ১ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। একইভাবে, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকায় ভিডিও ল্যারিঙ্গোস্কোপ কিনেছে, যার বাজার মূল্য ছিল ১ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা, নিম্নমানের সরঞ্জাম সরবরাহ, এবং সরবরাহ না করেই ঠিকাদারকে বিল পরিশোধের মতো ঘটনাও অহরহ ঘটছে। এমনকি, কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) গত বছর প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সুরক্ষাসামগ্রী কিনেছিল সরকারি আইন ও বিধি না মেনেই, যেখানে অনেক ক্ষেত্রে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি পর্যন্ত ছিল না এবং ৩৫০ কোটি টাকার জরুরি কেনাকাটায় ১৯৩ কোটি টাকার অনিয়ম পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ভেজা কেএন-৯৫ মাস্ক সরবরাহের ঘটনাও ছিল।
সাম্প্রতিক সময়েও দুর্নীতির বেশ কিছু ঘটনা সামনে এসেছে। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও কম্পিউটার কেনাকাটায় কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। টেন্ডার অনুযায়ী এইচপি ব্র্যান্ডের ১২তম জেনারেশনের ২০০টি ডেস্কটপ কম্পিউটার কেনার কথা থাকলেও সরবরাহ করা হয়েছে পুরনো ও ব্র্যান্ডবিহীন কম্পিউটার, যা সরকারের প্রায় ২ কোটি টাকার ক্ষতি করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া, ৬ হাজার জিপিডি ক্ষমতাসম্পন্ন পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্রের বদলে মাত্র ১২০০ জিপিডি'র একটি ইউনিট সরবরাহ করা হয়েছে। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও ২৪ কোটি টাকার ওষুধ কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে, যেখানে ৪ কোটি টাকার বেশি লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে এবং ১০১ টাকার ওষুধ ১২৯৯ টাকায় বিক্রি করার ঘটনাও ঘটেছে। কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে, যা তদন্তাধীন রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের আলোচিত ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম ওরফে মিঠু, যিনি বিদেশে বসেই পুরো স্বাস্থ্য খাত নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের একটি মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন। এসব ঘটনা স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির গভীরতা এবং এর সাথে জড়িত প্রভাবশালী চক্রের ক্ষমতাকেই ইঙ্গিত করে।
কেনাকাটার বাইরেও নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রচলিত। দুদক জানিয়েছে, স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটা, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন, চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসাসেবায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং ওষুধ সরবরাহসহ মোট ১১টি খাতে দুর্নীতি বেশি হয়। ডাক্তাররা সাধারণত প্রত্যন্ত এলাকায় থাকতে চান না এবং সরকারি হাসপাতালে নিয়োগ-বদলি, পদোন্নতি ও প্রশিক্ষণার্থী বাছাইয়ে কোনো নীতিমালা মানা হয় না। স্বার্থান্বেষী মহল এসব কাজে টাকা আদায় করে, যেখানে সাধারণ চিকিৎসকদের বদলি বা পদোন্নতির জন্য ক্ষেত্রবিশেষে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ পোস্টের ক্ষেত্রে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে উঠেছে, যারা বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি এবং টেন্ডারসংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের ফলে অদক্ষ ও অযোগ্য ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হচ্ছেন, যা সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার মানকে নিম্নমুখী করছে এবং জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন করছে।
কোভিড-১৯ মহামারীকালে স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা ও দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র আরও প্রকটভাবে উন্মোচিত হয়েছে। টিআইবি'র মতে, মহামারীকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির মহোৎসব হয়েছে। যেখানে সরকারি কর্মকর্তারা জড়িত, সেখানে দুর্নীতির বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, কিন্তু বড়জোর বদলি ছাড়া তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতও সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে, গত ১৫ বছরে অপরিকল্পিতভাবে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা, দুর্নীতি এবং সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে দেশের অনেক সরকারি হাসপাতালে কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা যন্ত্রপাতি অচল অবস্থায় পড়ে আছে। স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়লেও দুর্নীতির কারণে এর সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। এই পরিস্থিতি দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক হুমকি এবং দ্রুত এর প্রতিকার না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
সুপারিশ: স্বাস্থ্য খাতের এই ভয়াবহ দুর্নীতি প্রতিরোধে অবিলম্বে কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। প্রথমত, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) এবং ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) এর বিধানাবলী কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে এবং ক্রয় কমিটিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা অত্যাবশ্যক। দ্বিতীয়ত, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয় বন্ধ করে চাহিদাভিত্তিক কেনাকাটা নিশ্চিত করতে হবে এবং যন্ত্রপাতি সরবরাহের আগে তা চালানোর জন্য দক্ষ জনবল নিয়োগের বিধান করতে হবে। তৃতীয়ত, নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং যেকোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। চতুর্থত, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর ২৫ দফা সুপারিশের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সকল প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে না থাকে। পঞ্চমত, হাসপাতাল পর্যায়ে সিটিজেন চার্টার প্রদর্শন এবং হাসপাতালে কী কী ওষুধ স্টকে আছে তা প্রকাশ্যে জানানোর বিধান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ তাদের প্রাপ্য সেবা সম্পর্কে অবগত থাকতে পারে। পরিশেষে, স্বাস্থ্য খাতের সকল কার্যক্রমে ডিজিটাল নজরদারি বৃদ্ধি এবং তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে দুর্নীতির সুযোগ কমাতে হবে।