সম্প্রতি, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) একটি বিজ্ঞপ্তিতে জানায় যে, ২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিকে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ১৯ লাখ, যার মধ্যে প্রায় ৬৩% ব্যবহারকারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সক্রিয়। এর মধ্যে প্রায় ৪.৫ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারী এবং ১.৫ কোটির বেশি ইউটিউব ব্যবহারকারী রয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক ব্যবহারকারীকে ঘিরে গড়ে ওঠা অ্যালগরিদম-নির্ভর ডিজিটাল বাস্তুতন্ত্রে ভুল তথ্য (misinformation), বিদ্বেষমূলক বক্তব্য (hate speech) এবং সাইবার বুলিংয়ের মতো সমস্যাগুলো এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে, সম্প্রতি একটি প্রধান সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মে একটি জাতীয় সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় এবং তা দ্রুত ভাইরাল হয়ে যাওয়ায় জনমনে ব্যাপক বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা তৈরি হয়, যা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকেও প্রভাবিত করার উপক্রম হয়েছিল। এই ঘটনাটি আবারও প্রশ্ন তুলেছে যে, সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ডস ও অ্যালগরিদম কি নীতি প্রণেতাদের দুর্বল আইন ও তদারকির ব্যর্থতার ফসল, নাকি এটি বিশ্বব্যাপী একটি সিস্টেমিক দুর্বলতা, যা দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল ল্যান্ডস্কেপে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাকে চ্যালেঞ্জিং করে তুলছে?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যালগরিদমগুলো ব্যবহারকারীর পছন্দ, অতীত কার্যকলাপ এবং মিথস্ক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে কন্টেন্ট প্রদর্শন করে, যা তথ্যের একপেশে প্রবাহ (filter bubble) তৈরি করে এবং প্রায়শই পোলারাইজেশন বা মেরুকরণকে উৎসাহিত করে। যখন কোনো নির্দিষ্ট বিষয় বা হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিং হয়, তখন অ্যালগরিদম সেই কন্টেন্টকে আরও বেশি প্রচার করে, এমনকি যদি তা ভুল বা ক্ষতিকর তথ্যও হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ (বর্তমানে বিলুপ্ত) এবং এর পরবর্তী সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এর মাধ্যমে এই ধরনের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। তবে, এই আইনগুলোর প্রয়োগ নিয়ে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। সমালোচকরা বলছেন যে, এই আইনগুলো প্রায়শই মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করে এবং প্ল্যাটফর্মের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার চেয়ে ব্যবহারকারীদের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপে বেশি মনোযোগ দেয়। অন্যদিকে, প্ল্যাটফর্মগুলো নিজেরাই তাদের অ্যালগরিদমকে এমনভাবে ডিজাইন করে যা ব্যবহারকারীদের বেশি সময় ধরে যুক্ত রাখতে সক্ষম, যা প্রায়শই সংবেদনশীল বা বিতর্কিত কন্টেন্টকে অগ্রাধিকার দেয় কারণ এগুলো বেশি মিথস্ক্রিয়া সৃষ্টি করে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) তাদের ডিজিটাল অর্থনীতি সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বারবার উল্লেখ করেছে যে, ডিজিটাল বিভাজন এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভুল তথ্যের বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে, যা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে নীতি নির্ধারণে একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই সংস্থাগুলো ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের জন্য নিরাপদ ও নৈতিক ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করার উপর জোর দিয়েছে, যা কেবল আইনের মাধ্যমে নয়, বরং প্রযুক্তিগত সমাধান এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সম্ভব।
২০২১ সালে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশের প্রায় ৬০% ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে সংবাদ ও তথ্য সংগ্রহ করে, যার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যাচাই না করেই তথ্য বিশ্বাস করে। এটি অ্যালগরিদম দ্বারা চালিত ট্রেন্ডগুলোর প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। যখন একটি নির্দিষ্ট বিষয় ভাইরাল হয়, তখন তা মূলধারার মিডিয়াতেও স্থান পায়, যা সেই ট্রেন্ডকে আরও বৈধতা দেয় এবং এর প্রভাব বিস্তার করে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর বৈশ্বিক চরিত্র এবং তাদের স্ব-নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা জাতীয় সরকারগুলোর জন্য একটি বড় বাধা। ফেসবুক, গুগল, টিকটক-এর মতো কোম্পানিগুলো তাদের অ্যালগরিদম ও ডেটা পরিচালনার পদ্ধতি সম্পর্কে খুব কম তথ্য প্রকাশ করে, যা তাদের উপর কার্যকর তদারকি করা কঠিন করে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট (DSA) এবং ডিজিটাল মার্কেটস অ্যাক্ট (DMA) এর মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মগুলোর উপর কঠোর নিয়ম আরোপ করলেও, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এ ধরনের আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের সক্ষমতা সীমিত। বাংলাদেশ সরকার, বিশেষত তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, এই প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে যাতে তারা বাংলাদেশের আইন ও সংস্কৃতি মেনে চলে। তবে, এই আলোচনাগুলো প্রায়শই প্ল্যাটফর্মগুলোর বৈশ্বিক নীতি দ্বারা সীমাবদ্ধ থাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যালগরিদমগুলো শুধু ভুল তথ্যই নয়, বরং মানসিকভাবে ক্ষতিকর কন্টেন্ট, যেমন – সাইবার বুলিং এবং আত্মঘাতী প্রবণতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে, যা তরুণ প্রজন্মের উপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই সমস্যাগুলো কেবল আইনি কাঠামো দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়, বরং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং সামাজিক সচেতনতার একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
| বছর | মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (কোটি) | সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী (কোটি) | ভুল তথ্যের শিকার (%) |
|---|---|---|---|
| ২০২০ | ১১.২৫ | ৬.৫০ | ৪৫% |
| ২০২১ | ১২.৩০ | ৭.৮০ | ৫০% |
| ২০২২ | ১৩.০০ | ৯.০০ | ৫২% |
| ২০২৩ | ১৩.১৯ | ১০.২০ | ৫৫% |
উৎস: বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সমীক্ষা, World Bank ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট।
সুপারিশ
- বাংলাদেশ সরকার, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বাধীন 'ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম রেগুলেটরি অথরিটি' প্রতিষ্ঠা করবে, যা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম স্বচ্ছতা, ডেটা ব্যবহার নীতি এবং কন্টেন্ট মডারেশন প্রক্রিয়ার উপর নিয়মিত নিরীক্ষা চালাবে এবং European Union-এর ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট (DSA) এর আদলে একটি স্থানীয় আইন প্রণয়ন করবে।
- শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় যৌথভাবে জাতীয় পাঠ্যক্রমে ডিজিটাল সাক্ষরতা ও মিডিয়া লিটারেসি বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক করবে, যেখানে শিক্ষার্থীদের ভুল তথ্য শনাক্তকরণ, অ্যালগরিদমের কার্যকারিতা বোঝা এবং অনলাইনে নিরাপদ থাকার কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, এবং প্রতিটি জেলায় 'ডিজিটাল লিটারেসি হাব' স্থাপন করবে।
- ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) এর আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তায়, বাংলাদেশ সরকার একটি জাতীয় ডেটা সেন্টার এবং সাইবার নিরাপত্তা গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তুলবে, যা স্থানীয়ভাবে ডেটা সংরক্ষণ, অ্যালগরিদম-জনিত ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে ভুল তথ্য ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রতিরোধে কার্যকর প্রযুক্তিগত সমাধান উদ্ভাবনে কাজ করবে।