মেডিকেল রিসার্চ ও বায়োটেকনোলজি: জিন এডিটিংয়ের নৈতিক সীমানা ও বাংলাদেশের আইনগত প্রস্তুতি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মেডিকেল রিসার্চ ও বায়োটেকনোলজি: জিন এডিটিংয়ের নৈতিক সীমানা ও বাংলাদেশের আইনগত প্রস্তুতি

ড. সাবরিনা ইয়াসমিন  avatar   
ড. সাবরিনা ইয়াসমিন
মেডিকেল রিসার্চ ও বায়োটেকনোলজি: জিন এডিটিংয়ের নৈতিক সীমানা ও বাংলাদেশের আইনগত প্রস্তুতি
মেডিকেল রিসার্চ ও বায়োটেকনোলজি: জিন এডিটিংয়ের নৈতিক সীমানা ও বাংলাদেশের আইনগত প্রস্তুতি
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জিন এডিটিং প্রযুক্তির নৈতিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে একটি বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য স...

সম্প্রতি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জিন এডিটিং প্রযুক্তির নৈতিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে একটি বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিবেদনে ক্রিস্পার (CRISPR) প্রযুক্তির মতো শক্তিশালী জিনোম এডিটিং টুলসগুলোর দ্রুত অগ্রগতির পাশাপাশি এর অপব্যবহারের ঝুঁকি এবং সুষম নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জিন এডিটিং গবেষণায় অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে নৈতিক কাঠামোর উন্নয়ন ও আইনগত প্রস্তুতি গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল (BMRC) এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই বিষয়ে এখনই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যাতে আধুনিক বায়োটেকনোলজির সুফল দেশের মানুষের কাছে পৌঁছানো যায় এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো এড়ানো যায়।

জিন এডিটিং প্রযুক্তি, বিশেষ করে CRISPR-Cas9 পদ্ধতি, মানবদেহের বিভিন্ন জেনেটিক রোগ যেমন সিকেল সেল অ্যানিমিয়া, থ্যালাসেমিয়া এবং এমনকি ক্যান্সার নিরাময়ে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তবে, এই প্রযুক্তির প্রয়োগ শুধুমাত্র রোগ নিরাময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মানব ভ্রূণের জিনগত পরিবর্তন, যা 'জার্মলাইন এডিটিং' নামে পরিচিত, সেই বিতর্কিত ক্ষেত্রটিতেও প্রবেশ করেছে। এই ধরনের পরিবর্তন মানুষের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে, যা সামাজিক, নৈতিক এবং ধর্মীয় প্রশ্ন উত্থাপন করে। বাংলাদেশে, যেখানে থ্যালাসেমিয়ার মতো জেনেটিক রোগের প্রাদুর্ভাব তুলনামূলকভাবে বেশি, সেখানে জিন এডিটিং গবেষণা ও থেরাপির সম্ভাবনা অপরিসীম। তবে, এর নিয়ন্ত্রণের অভাবে অহেতুক 'ডিজাইনার বেবি' তৈরির মতো অনৈতিক প্রবণতা দেখা যেতে পারে। বর্তমানে, বাংলাদেশ সরকার বায়োসেফটি ও বায়োএথিক্স নিয়ে কিছু নীতিমালা প্রণয়ন করলেও, জিন এডিটিংয়ের মতো দ্রুত বিকশিত প্রযুক্তির জন্য সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক আইনগত কাঠামো এখনও অনুপস্থিত।

এই প্রযুক্তির সম্ভাবনার পাশাপাশি এর অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল উদ্বিগ্ন। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে বায়োটেকনোলজি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন দেশকে উৎসাহিত করছে, তবে তারা নৈতিক তদারকি ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপরও জোর দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক তাদের 'Health, Nutrition and Population Global Practice' এর অধীনে বায়োটেকনোলজি গবেষণায় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তার জন্য প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি তহবিল গঠন করেছে, যেখানে নৈতিক পর্যালোচনা কমিটির কার্যক্রম জোরদার করার শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশে, জিন এডিটিং গবেষণায় অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (BCSIR) এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সীমিত আকারে সহায়তা প্রদান করলেও, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি জাতীয় বায়োএথিক্স কমিটি ও তার কার্যকারিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। দেশের প্রধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (BSMMU) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি বিভাগ, জিন এডিটিং গবেষণায় প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও, তাদের জন্য একটি সুসংগঠিত আইনি ও নৈতিক কাঠামো প্রণয়ন না হলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা লাভ করা কঠিন হবে।

জিন এডিটিং প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে দেশীয় সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ। World Bank এবং ADB এর মতো সংস্থাগুলো বায়োটেকনোলজি গবেষণায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণ করার পরামর্শ দেয়। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং আইন মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে এই বিষয়ে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। জাতীয় বায়োএথিক্স কমিটির সদস্যপদ শুধুমাত্র চিকিৎসাবিজ্ঞানী বা জীববিজ্ঞানী নয়, বরং আইন বিশেষজ্ঞ, ধর্মীয় পণ্ডিত, সমাজবিজ্ঞানী এবং সাধারণ নাগরিকদের প্রতিনিধিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যাতে প্রযুক্তির নৈতিক ও সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়।

সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩ (প্রাক্কলিত)
ওয়ার্ল্ড ব্যাংক কর্তৃক বায়োটেকনোলজি গবেষণায় উন্নয়নশীল দেশসমূহে অনুমোদিত তহবিল (মিলিয়ন USD) ৩৮০ ৪৫০ ৫২০ ৫৫০
বাংলাদেশে জেনেটিক ডিসঅর্ডার স্ক্রিনিং কর্মসূচির আওতায় আসা জনসংখ্যার শতকরা হার ২.৫% ৩.২% ৪.১% ৪.৮%
এডিবি কর্তৃক স্বাস্থ্য খাতে প্রযুক্তিগত সহায়তার জন্য অনুমোদিত তহবিল (মিলিয়ন USD) ১৫০ ১৮০ ২০০ ২২০
বাংলাদেশে জিন এডিটিং সংক্রান্ত গবেষণামূলক প্রকাশনার সংখ্যা (বার্ষিক) ১২ ১৫ ১৮

উৎস: World Bank, ADB বার্ষিক প্রতিবেদন, বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল (BMRC) ও জাতীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক 'জাতীয় বায়োএথিক্স আইন' প্রণয়ন করা, যেখানে জিন এডিটিং (বিশেষত জার্মলাইন এডিটিং) এর সুনির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা, গবেষণা প্রোটোকল অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং অননুমোদিত ব্যবহারের জন্য শাস্তির বিধান সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে।
  • বাংলাদেশ সরকার, আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে, বিদ্যমান 'বায়োসেফটি রুলস ২০১২' এবং 'বায়োসেফটি গাইডলাইনস ২০১০' সংশোধন ও পরিমার্জন করে জিন এডিটিং প্রযুক্তির জন্য একটি পৃথক 'জিনোম এডিটিং রেগুলেশনস' অন্তর্ভুক্ত করবে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (যেমন WHO এর নির্দেশিকা) এবং স্থানীয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
  • বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল (BMRC) এর অধীনে একটি স্থায়ী ও স্বাধীন 'জাতীয় জিন এডিটিং নৈতিক পর্যালোচনা কমিটি' গঠন করা, যার সদস্যপদ বিভিন্ন পেশা ও মতাদর্শের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত হবে এবং যার প্রধান কাজ হবে দেশে পরিচালিত সকল জিন এডিটিং গবেষণা প্রকল্পের নৈতিক অনুমোদন ও তদারকি করা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে নিয়মিত প্রতিবেদন দাখিল করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. সাবরিনা ইয়াসমিন

ড. সাবরিনা ইয়াসমিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মেডিকেল রিসার্চ ও বায়োটেকনোলজি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator