২০২১ সালে শুরু হওয়া 'বিচারিক কার্যক্রমের আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশন' প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের অগ্রগতি সম্প্রতি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে, যা দেশের বিচার ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। একটি সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ সরকার বিচার বিভাগের আধুনিকায়নে যে বিনিয়োগ করেছে, তা কেবল প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং বিচারপ্রার্থী জনগণের জন্য ন্যায়বিচারকে আরও সহজলভ্য ও দ্রুততর করার এক সামাজিক অঙ্গীকার। এই প্রকল্পের আওতায় ভার্চুয়াল কোর্ট, ই-ফাইলিং সিস্টেম এবং সমন্বিত মামলা ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির মতো অত্যাধুনিক প্ল্যাটফর্মগুলো বিচারিক প্রক্রিয়াকে গতিশীল করতে শুরু করেছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় যখন শারীরিক উপস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, তখন ভার্চুয়াল আদালত দ্রুত চালু হয়ে বিচারিক কার্যক্রম সচল রাখতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে, যা এই ডিজিটাল রূপান্তরের কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয়তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত সংযোজন নয়, বরং বিচার বিভাগের কর্মপদ্ধতি, বিচারিক সংস্কৃতি এবং জনগণের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ধারণায় এক মৌলিক পরিবর্তন আনছে, যা ডিজিটাল বাংলাদেশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই ডিজিটাল রূপান্তরের মূল উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা মামলার জট কমানো, বিচারিক প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করা এবং বিচারপ্রার্থীদের সময় ও খরচ সাশ্রয় করা। প্রকল্পের প্রথম ধাপে প্রাথমিক অবকাঠামো স্থাপন ও পাইলট প্রকল্প চালু করা হয়, যেখানে সীমিত পরিসরে ই-ফাইলিং এবং ভার্চুয়াল শুনানি শুরু হয়েছিল। দ্বিতীয় ধাপে এর পরিধি ব্যাপক করা হয়েছে, যেখানে দেশের বিভিন্ন জেলা ও দায়রা জজ আদালত, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এবং উচ্চ আদালতের কিছু বেঞ্চে ডিজিটাল সুবিধা সম্প্রসারিত করা হয়েছে। এই সম্প্রসারণের মধ্যে রয়েছে আধুনিক ডেটা সেন্টার স্থাপন, বিচারক ও আদালতের কর্মীদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ এবং সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার সরবরাহ। বাংলাদেশ সরকার এই রূপান্তরকে শুধুমাত্র একটি প্রকল্প হিসেবে দেখছে না, বরং এটি তাদের 'ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প ২০৪১' এর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে, যার লক্ষ্য হচ্ছে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ এবং সুশাসন নিশ্চিত করা। এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগের প্রতিটি স্তরে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে, যাতে প্রতিটি মামলা দায়ের থেকে শুরু করে রায় প্রদান পর্যন্ত সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত হতে পারে, যা একদিকে যেমন কাগজের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব একটি ব্যবস্থা তৈরি করছে, অন্যদিকে তেমনি মামলা নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলে বিচার বিভাগ আরও বেশি কার্যকর ও গতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছে। বিশ্বব্যাংকের 'জাস্টিস সেক্টর মডার্নাইজেশন প্রজেক্ট' (Justice Sector Modernization Project) এর মাধ্যমে বিচার বিভাগের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ই-জুডিশিয়ারি সিস্টেমের বাস্তবায়ন এবং বিচারকদের ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে সহায়তা করা হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় বিচারিক তথ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেম (Judicial Information Management System - JIMS) তৈরি করা হয়েছে, যা মামলা দায়ের, শুনানি ও নিষ্পত্তির তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের সুযোগ করে দিয়েছে। অন্যদিকে, এডিবি তার 'গভর্নেন্স ইমপ্রুভমেন্ট প্রোগ্রাম' এর অধীনে বিচার বিভাগের দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে, বিশেষ করে বিচারিক প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করতে এবং দুর্নীতির সুযোগ কমাতে প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছে। তবে, এই অগ্রগতি সত্ত্বেও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ এখনও বিদ্যমান। দূরবর্তী অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগের দুর্বলতা, ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব, এবং পুরনো আইন ও প্রক্রিয়াকে নতুন ডিজিটাল কাঠামোর সাথে সমন্বয় করার মতো বিষয়গুলো এখনও বড় বাধা। এছাড়াও, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিচারিক তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা একটি চলমান চ্যালেঞ্জ, যার জন্য নিরন্তর প্রযুক্তিগত আপগ্রেডেশন এবং সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যৌথভাবে কাজ করছে, যাতে বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর একটি টেকসই এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়া হয়।
| সূচক | ২০২২ | ২০২৩ | ২০২৪ (লক্ষ্য) | মন্তব্য |
|---|---|---|---|---|
| ভার্চুয়াল শুনানির মাধ্যমে নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা | ৩,৫০,০০০+ | ৫,০০,০০০+ | ৭,০০,০০০+ | কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়েও ভার্চুয়াল কোর্টের কার্যকারিতা বৃদ্ধি |
| ই-ফাইলিং ব্যবস্থার আওতাভুক্ত আদালতের সংখ্যা | ৩৫০ | ৫০০ | ৭৫০ | জেলা ও দায়রা জজ আদালত, মেট্রোপলিটন আদালত সহ |
| ডিজিটাল মামলা ব্যবস্থাপনা সিস্টেম (ICMS) ব্যবহারকারী বিচারকের সংখ্যা | ১,২০০+ | ১,৫০০+ | ১,৮০০+ | নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি |
| ডিজিটাল বিচারিক অবকাঠামোতে বিশ্বব্যাংকের বিনিয়োগ | $৩০ মিলিয়ন | $৪০ মিলিয়ন | $৫০ মিলিয়ন (প্রক্ষেপিত) | প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে আর্থিক সহায়তা |
| আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি | ১৫% | ২০% | ২৫% | বার্ষিক বাজেটে ডিজিটাল রূপান্তরের প্রতি অগ্রাধিকার |
উৎস: আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বিশ্বব্যাংকের যৌথ প্রতিবেদন, ২০২৪।
সুপারিশ
- বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (BCC) এবং সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ এর অধীনে বিচার বিভাগের সাইবার নিরাপত্তা অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। বিচারিক ডেটা এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা (Security Audits) পরিচালনা এবং ডেটা সুরক্ষায় অত্যাধুনিক এনক্রিপশন প্রযুক্তি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস বা সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি কমানো যায়।
- জুডিসিয়াল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটকে আধুনিক ডিজিটাল বিচার ব্যবস্থার ওপর নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া উচিত। এই কর্মসূচিতে বিচারক, আইনজীবী এবং আদালতের কর্মীদের জন্য ই-ফাইলিং, ভার্চুয়াল শুনানি প্রোটোকল, ডিজিটাল ফরেনসিক এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে তারা নতুন প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারেন।
- বাংলাদেশ সরকারের 'ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প ২০৪১' এর অংশ হিসেবে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তায় দূরবর্তী আদালতগুলোতে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ এবং হার্ডওয়্যার সরবরাহ নিশ্চিত করতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগকে (ICT Division) একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া উচিত। এটি গ্রামীণ এলাকার বিচারপ্রার্থী জনগণের জন্য ডিজিটাল বিচার ব্যবস্থার সুবিধা পৌঁছে দেবে এবং 'অ্যাক্সেস টু জাস্টিস' নিশ্চিত করবে।