সম্প্রতি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশের উচ্চ আদালত ও অধস্তন আদালতসমূহে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪৭ লাখ ছাড়িয়েছে, যা ই-ফাইলিং ব্যবস্থার প্রাথমিক প্রয়োগ সত্ত্বেও মামলাজট নিরসনে কাঙ্ক্ষিত গতি আনতে পারেনি। এই বিপুল সংখ্যক মামলার বোঝা একদিকে যেমন বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে বিচার বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। যদিও বাংলাদেশ সরকার, বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB)-এর যৌথ সহায়তায় বিচার বিভাগে ডিজিটাল রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে, ই-ফাইলিং ব্যবস্থার বাস্তবায়নে কিছু জটিলতা এখনও বিদ্যমান, যা এই মামলার স্তূপকে নতুন মাত্রায় বিশ্লেষণ করা জরুরি করে তুলেছে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশ হিসেবে বিচার বিভাগকে আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে ই-ফাইলিং প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল মামলা দায়ের প্রক্রিয়াকে সহজ করা, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা এবং বিচারিক কার্যক্রমের গতিশীলতা আনা। প্রাথমিকভাবে, সুপ্রিম কোর্ট এবং কিছু অধস্তন আদালতে এই ব্যবস্থা চালু করা হলেও, এর পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতা এখনও প্রশ্নবিদ্ধ। দেখা যাচ্ছে, ই-ফাইলিং প্ল্যাটফর্মের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, বিশেষত গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের আদালতগুলোতে প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের অপ্রতুলতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে, বিচারক, আইনজীবী এবং আদালত কর্মচারীদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার অভাব ই-ফাইলিং পদ্ধতির সঠিক প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর 'জাস্টিস সেক্টর রেফর্ম অ্যান্ড ডিজিটালাইজেশন প্রজেক্ট'-এর আওতায় প্রদত্ত তহবিল সত্ত্বেও, স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণের মান এবং ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা যায়নি, যার ফলে ম্যানুয়াল ফাইলিং পদ্ধতি থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তরে এক ধরনের দ্বিধা ও অনীহা কাজ করছে। এছাড়াও, সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ডেটা সুরক্ষার বিষয়ে পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব ই-ফাইলিং-এর প্রতি আস্থা অর্জনে বাধা দিচ্ছে, যা বিচারিক প্রক্রিয়ার সংবেদনশীলতার কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ই-ফাইলিং ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়ন কেবল প্রযুক্তিগত স্থাপনার উপর নির্ভরশীল নয়, বরং এর সাথে জড়িত মানবসম্পদের দক্ষতা ও মানসিকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB)-এর 'লিগ্যাল অ্যান্ড জুডিশিয়াল রিফর্ম প্রজেক্ট'-এর মাধ্যমে সরবরাহকৃত কারিগরি সহায়তা সত্ত্বেও, বিভিন্ন আদালতে ই-ফাইলিং-এর জন্য নির্ধারিত কর্মীর অভাব এবং বিদ্যমান কর্মীদের মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতার তারতম্য একটি বড় সমস্যা। অনেক আইনজীবী, বিশেষ করে প্রবীণ আইনজীবীরা, নতুন এই পদ্ধতির সাথে মানিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছেন, যার ফলে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মামলা দায়েরের হার প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। এর পাশাপাশি, ই-ফাইলিং পোর্টালের ব্যবহারকারী-বান্ধব ইন্টারফেসের অভাব এবং বিভিন্ন আদালত ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যারের মধ্যে আন্তঃঅপারেবিলিটির অনুপস্থিতি মামলা পরিচালনায় জটিলতা তৈরি করছে। উদাহরণস্বরূপ, এক আদালতের ই-ফাইলিং সিস্টেমের সাথে অন্য আদালতের বা আপিল বিভাগের সিস্টেমের ডেটা বিনিময়ে এখনও নানা ধরনের কারিগরি ও প্রশাসনিক বাধা রয়েছে। এই বিচ্ছিন্নতা সামগ্রিক বিচারিক প্রক্রিয়ায় ধীরগতি আনছে এবং ডিজিটাল রূপান্তরের সুফলকে সীমিত করে রাখছে, যা মামলাজট নিরসনের লক্ষ্যকে আরও দূরবর্তী করে তুলছে।
| বছর | মোট বিচারাধীন মামলা (লক্ষ) | ই-ফাইলিং-এর মাধ্যমে দায়েরকৃত মামলার শতাংশ | প্রশিক্ষিত বিচারক ও আইনজীবীর সংখ্যা (আনুমানিক) |
|---|---|---|---|
| ২০২১ | ৪০.২৫ | ৫.৫% | ৫,০০০ |
| ২০২২ | ৪৪.২০ | ৯.২% | ৭,৫০০ |
| ২০২৩ | ৪৬.৫০ | ১৩.৮% | ১০,০০০ |
| ২০২৪ (প্রথম প্রান্তিক) | ৪৭.১০ | ১৫.০% | ১১,৫০০ |
উৎস: আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়; বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট; World Bank ও ADB-এর প্রকল্প প্রতিবেদন।
সুপারিশ
- বিচার বিভাগের জন্য একটি সুসংহত ও কেন্দ্রীয় ডিজিটাল পরিকাঠামো স্থাপন করতে হবে, যা বাংলাদেশ সরকারের 'জাতীয় ই-গভর্নেন্স আর্কিটেকচার (NEGAP)' ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে একটি সমন্বিত 'জুডিশিয়াল ডেটা হাব' তৈরি করবে। এই হাব সকল আদালত ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করবে এবং আন্তঃঅপারেবিলিটি নিশ্চিত করবে।
- আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক একটি বাধ্যতামূলক ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে, যা 'জুডিশিয়াল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট' এবং 'বাংলাদেশ বার কাউন্সিল'-এর সহযোগিতায় বিচারক, আইনজীবী ও আদালত কর্মচারীদের ই-ফাইলিং, সাইবার নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল ডেটা ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি করবে। এর জন্য 'তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬'-এর অধীনে প্রয়োজনীয় নীতিগত নির্দেশনা জারি করা যেতে পারে।
- ই-ফাইলিং সিস্টেমের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে 'ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮' এর আওতায় কঠোর প্রোটোকল ও অডিট ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং World Bank ও ADB-এর সহায়তায় একটি স্বতন্ত্র 'জুডিশিয়াল সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট' গঠন করতে হবে, যা বিচারিক ডেটা সুরক্ষায় কাজ করবে এবং নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা পরিচালনা করবে।