ফ্রিল্যান্সিং ও রিমোট ওয়ার্ক ইকোনমি: গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন দিগন্ত ও ডিজিটাল বিভাজন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ফ্রিল্যান্সিং ও রিমোট ওয়ার্ক ইকোনমি: গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন দিগন্ত ও ডিজিটাল বিভাজন

নুরুল ইসলাম  avatar   
নুরুল ইসলাম
ফ্রিল্যান্সিং ও রিমোট ওয়ার্ক ইকোনমি: গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন দিগন্ত ও ডিজিটাল বিভাজন
ফ্রিল্যান্সিং ও রিমোট ওয়ার্ক ইকোনমি: গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন দিগন্ত ও ডিজিটাল বিভাজন
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) কর্তৃক প্রকাশিত 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি, ২০২২'-এর খসড়ায় ফ্রিল্যান্সিং ও রিমোট ওয়ার্ককে দেশের অর্থনৈতিক...

সম্প্রতি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) কর্তৃক প্রকাশিত 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি, ২০২২'-এর খসড়ায় ফ্রিল্যান্সিং ও রিমোট ওয়ার্ককে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। এই নীতিমালায় প্রযুক্তিগত দক্ষতা বিকাশের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে, যা ডিজিটাল বিভাজন নিরসনে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণদের কর্মসংস্থানে সহায়ক হতে পারে। বর্তমানে, বাংলাদেশের প্রায় ৬৫০,০০০ সক্রিয় ফ্রিল্যান্সার রয়েছে, যাদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গ্রামীণ বা আধা-শহুরে এলাকা থেকে কাজ করে। বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশ এখন অনলাইন শ্রম সরবরাহে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ, যা এই খাতের বিপুল সম্ভাবনাকে তুলে ধরে।

ফ্রিল্যান্সিং এবং রিমোট ওয়ার্কের এই ক্রমবর্ধমান ধারা গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনছে। ঐতিহ্যগতভাবে, গ্রামীণ এলাকার তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য শহরে পাড়ি জমাতে হতো, যার ফলে গ্রামীণ জনপদে মেধা ও শ্রমের সংকট দেখা দিত এবং শহরাঞ্চলে জনবসতির চাপ বাড়ত। কিন্তু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর সহজলভ্যতা এবং উচ্চ গতির ইন্টারনেট সংযোগের প্রসারের কারণে এখন গ্রামের তরুণ-তরুণীরা ঘরে বসেই আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের দক্ষতা বিক্রি করতে পারছে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়ছে, যা গ্রামীণ পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার মান উন্নত করছে এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাগুলোকে (SMEs) পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে। উদাহরণস্বরূপ, একজন ফ্রিল্যান্সারের আয় তার পরিবারকে আর্থিকভাবে স্থিতিশীল করছে, যার ফলস্বরূপ তারা স্থানীয় বাজার থেকে পণ্য ও সেবা ক্রয় করছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখছে। তবে, এই সুবিধাগুলো এখনও সবার কাছে পৌঁছায়নি, বিশেষ করে দুর্গম অঞ্চলে যেখানে ইন্টারনেটের অবকাঠামো দুর্বল এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব প্রকট।

এই সম্ভাবনার পাশাপাশি, ডিজিটাল বিভাজন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যুরো অফ এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্স (BANBEIS)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এখনও আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব বা পর্যাপ্ত ইন্টারনেট সুবিধা নেই, বিশেষ করে গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার স্কুল-কলেজগুলোতে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এবং Skills for Employment Investment Program (SEIP) এর মাধ্যমে বিভিন্ন বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রকল্প চালু থাকলেও, সেগুলোর পরিধি এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ প্রশিক্ষণের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে, প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু দ্রুত পরিবর্তনশীল ফ্রিল্যান্সিং বাজারের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলস্বরূপ, গ্রামীণ এলাকার শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে এবং ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) উচ্চশিক্ষা স্তরে ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও, গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ে এর বাস্তবায়ন এখনও ধীর গতিতে চলছে, যা ডিজিটাল বিভাজনকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

সূচক ২০১৯ ২০২১ ২০২৩ (প্রাক্কলিত)
সক্রিয় ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা (লক্ষ) ৪.৫ ৫.৮ ৬.৭
ফ্রিল্যান্সিং থেকে বার্ষিক আয় (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ০.৮ ১.২ ১.৬
গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর অনুপাত (%) ২৯ ৩৮ ৪৭
ডিজিটাল দক্ষতা প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত গ্রামীণ তরুণ (লক্ষ) ১.৫ ২.৩ ৩.১

উৎস: NSDA, BANBEIS, ICT বিভাগ ও বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত।

সুপারিশ

  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) কর্তৃক 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি, ২০২২'-এর আওতায় একটি সুনির্দিষ্ট 'ফ্রিল্যান্সিং ও রিমোট ওয়ার্ক নীতিমালা' প্রণয়ন করা, যেখানে গ্রামীণ ফ্রিল্যান্সারদের জন্য প্রণোদনা, কর সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে সহজীকরণের বিধান অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এবং Skills for Employment Investment Program (SEIP)-এর যৌথ উদ্যোগে দেশের প্রতিটি উপজেলায় কমপক্ষে একটি অত্যাধুনিক 'ফ্রিল্যান্সিং হাব' স্থাপন করা, যা উচ্চ গতির ইন্টারনেট, আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব এবং বাজার চাহিদাভিত্তিক (যেমন: এআই, ডেটা সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি) প্রশিক্ষণের সুযোগ দেবে, এবং এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC)-এর সাথে সমন্বয় করে কারিকুলাম তৈরি করা।
  • বাংলাদেশ ব্যুরো অফ এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্স (BANBEIS)-এর তত্ত্বাবধানে গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তর) ডিজিটাল সাক্ষরতা ও বেসিক ফ্রিল্যান্সিং দক্ষতা অর্জনের জন্য বাধ্যতামূলক পাঠ্যক্রম চালু করা এবং এই কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা প্রদান করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নুরুল ইসলাম

নুরুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ফ্রিল্যান্সিং ও রিমোট ওয়ার্ক ইকোনমি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator