বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন, বিশেষ করে ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) এবং অন্যান্য ক্রীড়া সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের কালো ছায়ায় আচ্ছন্ন। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে দেশের ক্রীড়া উন্নয়নের গতি বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফিফার নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, যা ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই অনিয়মগুলো কেবল আর্থিক ক্ষতিই করছে না, বরং দেশের ক্রীড়াঙ্গনের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করছে এবং তরুণ খেলোয়াড়দের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলছে।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) দুর্নীতির অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ফুটবলের বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা আর্থিক অনিয়ম ও তহবিল অপব্যবহারের দায়ে বাফুফের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ ও জরিমানা করেছে। একই অভিযোগে বাফুফের সিনিয়র সহ-সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদীসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদেরও জরিমানা করা হয়েছে। এসব ঘটনা বাফুফের আর্থিক ব্যবস্থাপনার গুরুতর দুর্বলতা উন্মোচন করে। এছাড়া, বাফুফের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন, সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। আপিল বিভাগও এই নির্দেশ বহাল রেখেছেন, যদিও ফিফার তহবিল সংক্রান্ত অভিযোগ অনুসন্ধানে সাময়িক স্থিতাবস্থা জারি ছিল। সম্প্রতি, ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের এক অডিটে বাফুফের ২০ কোটি টাকার সরকারি তহবিল ব্যবহারে অনিয়ম এবং মিথ্যা অডিট রিপোর্ট জমা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই তহবিল দীর্ঘমেয়াদী ফুটবল উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। যদিও মার্চ ২০২৫-এ ফিফা বাফুফের উপর থেকে ২০১৮ সাল থেকে আরোপিত আর্থিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে, যা নতুন সভাপতি তাবিথ আউয়ালের প্রচেষ্টার ফল। তবে, এটি বিগত বছরগুলোর ব্যাপক আর্থিক অব্যবস্থাপনারই ইঙ্গিত দেয়। এমনকি, অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় ফুটবল দলের প্রধান কোচ জেরার্ড জোন্স বেতন না পাওয়া এবং নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়ে বাফুফের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন।
কেবল বাফুফেই নয়, দেশের অন্যান্য ক্রীড়া সংস্থাগুলোতেও অনিয়মের চিত্র প্রকট। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ)-এর ৩৩ জন কর্মকর্তার মধ্যে ২৭ জনই 'অবৈধ' এবং আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) নিয়ম লঙ্ঘন করে বছরের পর বছর ধরে পদে আছেন বলে যমুনা টেলিভিশনের এক অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। এছাড়া, বিওএ-এর নাম ব্যবহার করে ফেসবুকে ভুয়া লটারি পরিচালনার মাধ্যমে নিরীহ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাতের বিষয়েও সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) নিজেই 'অনিয়মের আখড়া' হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। স্টেডিয়ামের দোকান ভাড়া বাবদ সরকার বছরে প্রায় শত কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যেখানে প্রভাবশালীরা অনিয়মের মাধ্যমে লাভবান হচ্ছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে ক্রীড়া পরিদপ্তরেও দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। দুদক ভুয়া ভাউচার, একই ভাউচারে একাধিক বিল উত্তোলন এবং নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৩২ জন কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করে তদন্ত করছে। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন যে, গত ১৬ বছরে ক্রীড়া ক্ষেত্রে উন্নয়নের নামে 'মেগা দুর্নীতি' হয়েছে। তিনি ফেডারেশনগুলোর বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এই ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের ফলে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে না। আর্থিক অব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিতার অভাব ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন, খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। দুর্বল তদারকি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আইন ও নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়নের অভাব এই সমস্যাগুলোকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২০১৬ সালের গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও অদৃশ্য কারণে অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর ফলে খেলোয়াড়দের মধ্যে হতাশা বাড়ছে এবং দেশের ক্রীড়াঙ্গনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমছে।
ক্রীড়াঙ্গনে স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা না হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও ক্ষুণ্ন হবে এবং দেশের ক্রীড়া ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোকে কেবল খেলার উন্নয়নে মনোনিবেশ করতে হবে এবং আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে।
সুপারিশ: বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা উচিত: ১. সকল ক্রীড়া ফেডারেশন ও সংস্থাগুলোতে নিয়মিত, স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ অডিট পরিচালনা করা এবং অডিট রিপোর্ট জনসম্মুখে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করা। ২. দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-কে ক্রীড়াঙ্গনের সকল দুর্নীতির অভিযোগ দ্রুত ও কার্যকরভাবে তদন্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও স্বাধীনতা প্রদান করা এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। ৩. তহবিল বরাদ্দ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ও সরকারি তহবিলের অপব্যবহার রোধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা। ৪. খেলোয়াড়, ক্রীড়া সংগঠক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন তদারকি কমিটি গঠন করা, যা ক্রীড়া প্রশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার উপর নিয়মিত নজরদারি করবে। ৫. ক্রীড়া সংস্থাগুলোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মকর্তা নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং জবাবদিহিতার একটি শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করা।