ঢাকের শেষ বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর ভক্তদের অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। পাঁচ দিনের পূজা-অর্চনা, আনন্দ-উৎসব, মিলনমেলা ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ভক্তরা। উৎসবের আনন্দঘন পরিবেশের পর প্রতিমা বিসর্জনের মুহূর্তে পূজামণ্ডপগুলোতে নেমে আসে বিষাদের ছায়া। এক দিকে বিদায়ের বেদনা, অন্যদিকে আগামী শরতে আবারও দেবী দুর্গাকে বরণ করে নেওয়ার প্রত্যাশা এভাবেই শেষ হয় এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব।
ফরিদপুর উপজেলায় এ'বছর ১৮টি মন্দিরে শারদীয় দুর্গাপূজা উদ্যাপিত হয়। পূজাকে কেন্দ্র করে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। পূজামণ্ডপগুলো সাজানো হয় বর্ণিল সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা ও নানা আয়োজনে। পূজার দিনগুলোতে পূজা মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তদের পদচারণা, পূজা-অর্চনা, অঞ্জলি, আরতি, ধর্মীয় সংগীত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এবারের দুর্গোৎসবের সমাপ্তি ঘটে। সকাল থেকেই বিভিন্ন পূজামণ্ডপে দেবী দুর্গার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ভক্তরা। ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করে সম্পন্ন করা হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। পরে প্রতিমা নিয়ে বিসর্জনের উদ্দেশ্যে বের হন ভক্তরা। এ সময় ঢাক-ঢোল, কাঁসর, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে আশপাশের পরিবেশ।
প্রতিমা বিসর্জনের মুহূর্তে অনেক ভক্তকে আবেগাপ্লুত হতে দেখা যায়। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যে ছিল বিদায়ের আবেগ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর দেবীকে বরণ করে নেওয়া, কয়েক দিনের আনন্দ-উৎসবে অংশগ্রহণ এবং সবশেষে বিদায় জানানোর এই মুহূর্ত ভক্তদের মনে তৈরি করে এক ভিন্ন অনুভূতি। দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জনের সঙ্গে সঙ্গে যেন শেষ হয়ে যায় উৎসবের ব্যস্ততা; তবে রেখে যায় স্মৃতি, ভালোবাসা ও আগামী বছরের অপেক্ষা।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দুর্গাপূজা শুধু দেবী দুর্গার আরাধনার উৎসব নয়; এটি অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। অন্যায়, অশান্তি ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে ন্যায়, সত্য ও কল্যাণের জয়ই দুর্গোৎসবের অন্যতম শিক্ষা। তাই বিজয়া দশমী ভক্তদের কাছে যেমন বিদায়ের দিন, তেমনি নতুন আশায় সামনে এগিয়ে যাওয়ারও অনুপ্রেরণা।
ফরিদপুর উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে পূজার দিনগুলোতে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের পরিবেশও লক্ষ করা যায়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি হয়। এমন উৎসব সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে আরও সুদৃঢ় করে এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
দুর্গোৎসবকে ঘিরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা এবং ভক্তদের নির্বিঘ্নে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার বিষয়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা, জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ এবং বিসর্জন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আনসার ও ভিডিপি সদস্য ও পূজা উদ্যাপন কমিটির দায়িত্বশীলদের ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। উৎসবের শেষ দিনেও শান্তি-শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসব সম্পন্ন করার প্রত্যাশা ছিল সবার।
প্রতিমা বিসর্জনের পর পূজামণ্ডপগুলোতে ধীরে ধীরে কমে আসে মানুষের ভিড়। উৎসবের সাজসজ্জায় আলোকিত মণ্ডপগুলোতে নেমে আসে নীরবতা। কিন্তু ভক্তদের হৃদয়ে রয়ে যায় দেবী দুর্গাকে ঘিরে অসংখ্য স্মৃতি। বিদায়ের মুহূর্তে অনেকের কণ্ঠে শোনা যায় আগামী বছর আবারও দেবীকে বরণ করে নেওয়ার প্রত্যাশা ‘আবার হবে, আবার দেখা হবে।’
এভাবেই অশ্রুসিক্ত বিদায়, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে ফরিদপুর উপজেলায় শেষ হলো এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও ভক্তদের মনে শুরু হলো নতুন অপেক্ষা আগামী শরতে আবারও ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও উৎসবের আবহে দেবী দুর্গাকে বরণ করে নেওয়ার অপেক্ষা।