প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

তৌহিদুর রহমান  avatar   
তৌহিদুর রহমান
প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে প্রতি বছর মাথাপিছু প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ প্রায় ...

সম্প্রতি, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে প্রতি বছর মাথাপিছু প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ প্রায় ৩.৫ কেজি থেকে বেড়ে ৭.৫ কেজিতে দাঁড়িয়েছে গত এক দশকে, যার মধ্যে মাত্র ১০-১৫% সঠিকভাবে পুনর্ব্যবহার করা হয়। এই উদ্বেগজনক বৃদ্ধি দেশের প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং শিল্পের টেকসই ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, যেখানে একদিকে দ্রুত শিল্পায়ন ও ভোগ প্রবণতা বাড়ছে, অন্যদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা প্রকট হচ্ছে। এই পরিস্থিতি কি কেবল নীতি-নির্ধারকদের ব্যর্থতার ফল, নাকি দেশের সামগ্রিক সিস্টেমের গভীরে প্রোথিত দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি?

প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। পোশাক, খাদ্য, ঔষধ, ইলেকট্রনিক্স সহ প্রায় প্রতিটি খাতের পণ্য বিপণন ও সংরক্ষণে এই শিল্পের অবদান অনস্বীকার্য। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA)-এর তথ্য অনুযায়ী, এই শিল্পে প্রায় ৪,০০০ এরও বেশি ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ প্রতিষ্ঠান জড়িত রয়েছে, যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। তবে, এই দ্রুত প্রবৃদ্ধি পরিবেশগত চ্যালেঞ্জকে আরও ঘনীভূত করেছে। বিশেষ করে, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের (Single-Use Plastic) ব্যাপক ব্যবহার, যেমন – প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট, স্ট্র এবং শপিং ব্যাগ, নদী ও জলাভূমিকে দূষিত করছে এবং শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে। World Bank-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঢাকা শহরে দৈনিক প্রায় ৩,০০০ টনেরও বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার একটি বড় অংশ ড্রেন ও নদীনালায় পতিত হয়ে জলাবদ্ধতা এবং পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটাচ্ছে। এই সমস্যার সমাধানে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহার কমানোর জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হলেও, এর বাস্তবায়ন এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, যা আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সচেতনতার অভাবকেই নির্দেশ করে।

অন্যদিকে, এই শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির উপর উচ্চ নির্ভরশীলতাও একটি বড় দুর্বলতা। আন্তর্জাতিক বাজারে পলিমারের দামের অস্থিরতা সরাসরি দেশীয় উৎপাদন খরচকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (BPC) এর অধীনস্থ বিপিসি প্লাস্টিক লিমিটেডের মতো কিছু উদ্যোগ থাকলেও, তা দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট নয়। এর ফলে, অনেক ছোট ও মাঝারি উদ্যোগকে উচ্চমূল্যে কাঁচামাল কিনতে হয়, যা তাদের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয় এবং প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের এক গবেষণা পত্রে দেখিয়েছে যে, কাঁচামাল আমদানির উপর নির্ভরশীলতা কমাতে দেশীয়ভাবে পলিমার উৎপাদন এবং বায়ো-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকের গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। পাশাপাশি, সার্কুলার অর্থনীতির ধারণা, যেখানে প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদন, ব্যবহার এবং পুনর্ব্যবহার একটি চক্রাকার প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হয়, তা এখনও বাংলাদেশে সেভাবে মূলধারায় আসেনি। এর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, যেমন – উন্নত বর্জ্য পৃথকীকরণ ব্যবস্থা, আধুনিক পুনর্ব্যবহার প্ল্যান্ট এবং দক্ষ জনবল তৈরি করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও এই সিস্টেমের দুর্বলতার একটি প্রধান দিক, যা টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অগ্রগতিকে ব্যাহত করছে।

সূচক ২০১০ সাল ২০২০ সাল ২০৩০ সালের সম্ভাব্য লক্ষ্যমাত্রা (যদি বর্তমান ধারা বজায় থাকে)
মাথাপিছু প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন (কেজি/বছর) ৩.৫ ৭.৫ ১২.০
প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের হার (%) ৫-৭ ১০-১৫ ২০-২৫
প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং শিল্পের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি (%) ৮-১০ ১৫-১৮ ২০+
নদী ও জলাভূমিতে পতিত প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ (টন/দিন, প্রধান শহর) ১,৫০০ ৩,০০০ ৪,৫০০

উৎস: পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, World Bank, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA)

সুপারিশ

  • প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২২ এর কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পরিবেশ অধিদপ্তরকে আরও শক্তিশালী করা এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বিকল্প পণ্য উৎপাদনে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রণোদনা প্রকল্প চালু করা।
  • স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে প্রতিটি সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভায় আধুনিক বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং সংগ্রহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA) এর মাধ্যমে বিশেষ আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা।
  • নবায়নযোগ্য এবং বায়ো-ডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকের গবেষণা ও উন্নয়নে অর্থায়নের জন্য জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন তহবিল থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ বরাদ্দ করা, এবং এ বিষয়ে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ট্যাক্স ইনসেনটিভ প্রদান করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তৌহিদুর রহমান

তৌহিদুর রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator