পাঁচ আগস্ট: বিদায়ের দুই বছর পর কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ..

শরিফুল খান প্লাবন avatar   
শরিফুল খান প্লাবন
পাঁচ আগস্ট: বিদায়ের দুই বছর পর কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ..
পাঁচ আগস্ট: বিদায়ের দুই বছর পর কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ..
ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার বিদায়ের দুই বছর পর বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে? অর্জন, সংস্কারের ধীরগতি এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ নিয়ে একটি নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ।..

আগামীকাল পাঁচ আগস্ট। ক্যালেন্ডারের একটি সাধারণ দিন, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অসাধারণ দিন।

২০২৪ সালের এই দিনে বাংলাদেশ এক নজিরবিহীন পটপরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছিল। টানা পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের অবসান ঘটে এবং দেশ একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করে।

দুই বছর পর আজ যখন আমরা দিনটির দিকে ফিরে তাকাই, তখন আবেগের চেয়ে বিশ্লেষণ বেশি জরুরি। উল্লাস বা শোক নয়, প্রয়োজন একটি ঠান্ডা মাথার হিসাব-নিকাশ - পাঁচ আগস্ট কেন হয়েছিল, এর পর আমরা কী অর্জন করেছি এবং কোন চ্যালেঞ্জগুলো এখনো রয়ে গেছে।

পাঁচ আগস্টের প্রেক্ষাপট: কেন এই পটপরিবর্তন?

কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনই আকস্মিকভাবে ঘটে না। পাঁচ আগস্টের পেছনেও ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা নানা কারণ।

প্রথমত, এটি ছিল তরুণদের বঞ্চনাবোধ থেকে জন্ম নেওয়া একটি আন্দোলন। শুরুটা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে। কিন্তু দ্রুতই এই আন্দোলন রূপ নেয় বৃহত্তর রাষ্ট্র সংস্কারের আন্দোলনে। এর মূল কারণ ছিল কর্মসংস্থানের সংকট। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। একজন বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট যখন দেখেন মেধা নয়, বরং তদবিরই চাকরির প্রধান যোগ্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন তার মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। ব্রিটিশ কাউন্সিলের একটি জরিপে দেখা গিয়েছিল, দেশের ৫৫ শতাংশ তরুণ বিদেশে চলে যেতে আগ্রহী। এই হতাশ তরুণরাই পাঁচ আগস্টের প্রধান শক্তি ছিল।

দ্বিতীয়ত, এটি ছিল মত প্রকাশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। গত এক দশকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন আইনের প্রয়োগ নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। সাংবাদিক, শিক্ষক, এমনকি সাধারণ ফেসবুক ব্যবহারকারীরাও মামলার ভয়ে অনেক সময় নিজেদের মত প্রকাশ থেকে বিরত থাকতেন বলে অভিযোগ ছিল। মানুষ এমন একটি পরিবেশ চাইছিল যেখানে ভয় ছাড়া সমালোচনা করা যায়।

তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন। একদিকে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলের মতো বড় প্রকল্পে দেশের দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে, অন্যদিকে একই সময়ে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছিল। এই অর্থনৈতিক চাপও জন-অসন্তোষের একটি বড় কারণ ছিল।

এই তিনটি কারণ - কর্মসংস্থানের সংকট, মত প্রকাশে বাধা এবং অর্থনৈতিক চাপ - মিলিয়েই পাঁচ আগস্টের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল।
পাঁচ আগস্ট-পরবর্তী অর্জন: কী কী বদলেছে?
পাঁচ আগস্টের পর দুই বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে, যা উল্লেখ করা প্রয়োজন।

১. রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি: দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনীতি অনেকটা এককেন্দ্রিক হয়ে পড়েছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করতেন। পাঁচ আগস্টের পর রাজনৈতিক মাঠে বহুদলীয় প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, জাতীয় পার্টিসহ বহু দল অংশ নিয়েছে। নির্বাচনটি নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের তুলনায় বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল বলে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকরা মত দিয়েছেন।

২. জবাবদিহিতার আলোচনা জোরদার: জুলাই-আগস্টের ঘটনায় হতাহতের বিচারের দাবিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম এবং গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন গঠন - এই উদ্যোগগুলো একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আলোচনা এখন প্রকাশ্যে হচ্ছে, যা আগে খুব কমই হতো।

৩. সংস্কারের রোডম্যাপ তৈরি: অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কমিশন - নির্বাচন ব্যবস্থা, পুলিশ, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, জনপ্রশাসন ও সংবিধান সংস্কার - তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এই প্রতিবেদনগুলোতে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা, পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং দুদককে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ রয়েছে। এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি দলিল হয়ে থাকবে।

বড় চ্যালেঞ্জ: যেখানে এখনো ঘাটতি রয়ে গেছে
অর্জনের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট হয়েছে, যা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন।

প্রথম চ্যালেঞ্জ: আইন-শৃঙ্খলা ও সহনশীলতা: পাঁচ আগস্টের পরপরই দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিহিংসামূলক হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখলের ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর সংঘটিত রাজনৈতিক সহিংসতার একটি বড় অংশ ক্ষমতার হাতবদলের সাথে সম্পর্কিত। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারই হওয়া উচিত মূলনীতি। এই সহনশীলতার অভাব এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ: সংস্কার বাস্তবায়নের ধীরগতি: সংস্কার কমিশনগুলো রিপোর্ট দিলেও তার কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যেমন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রপতির আদেশে গণভোটের আয়োজন করা হলেও এর আইনি ভিত্তি ভবিষ্যতে আদালতে টিকবে কি না, তা নিয়ে আইনজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত আছে। কার্নেগি এন্ডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস তাদের এক বিশ্লেষণে বলেছে, ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর বাংলাদেশ আবার তার পুরনো রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভারসাম্যে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থাৎ, ব্যক্তি পরিবর্তন হলেও কাঠামোগত পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি হয়নি।

তৃতীয় চ্যালেঞ্জ: অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফেরেনি। ব্যবসায়ীদের একটি অংশের অভিযোগ, আগের মতোই তাদের চাঁদা বা অনানুষ্ঠানিক অর্থ দিতে হচ্ছে, শুধু গ্রহীতার পরিবর্তন হয়েছে। মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাথে কথা বললে এই অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও নীতি-ধারাবাহিকতা।

চতুর্থ চ্যালেঞ্জ: নারীর প্রতিনিধিত্ব: জুলাই আন্দোলনে নারীরা সামনের সারিতে থাকলেও ২০২৬ সালের নির্বাচনে মাত্র ৪ শতাংশ নারী প্রার্থী ছিলেন এবং সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র ৭ জন। এটি নতুন বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

আমাদের করণীয়: পাঁচ আগস্ট থেকে কী শিখব?

পাঁচ আগস্টকে যদি আমরা শুধু একটি দলের বিজয় বা অন্য দলের পরাজয় হিসেবে দেখি, তবে আমরা এর আসল শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবো।

এই দিনটি আমাদের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।

প্রথম শিক্ষা হলো, কোনো সরকারই জনগণের চেয়ে বড় নয়। উন্নয়ন প্রয়োজন, কিন্তু উন্নয়নের সাথে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকলে সেই উন্নয়ন টেকসই হয় না। ভবিষ্যতে যারাই ক্ষমতায় আসুক, তাদের এই বার্তাটি মনে রাখতে হবে।

দ্বিতীয় শিক্ষা হলো, রাষ্ট্র গঠন প্রতিশোধের ওপর ভিত্তি করে হয় না, ন্যায়বিচারের ওপর ভিত্তি করে হয়। পাঁচ আগস্টের আগে যারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের ন্যায়বিচার পাওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই বিচার হতে হবে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, পাল্টা দখল বা হামলার মাধ্যমে নয়।

তৃতীয় শিক্ষা হলো, সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। একটি নির্বাচন দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না। পুলিশ, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন করতে না পারলে আমরা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাব।

প্রবাসে বসে যখন প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাথে কথা বলি, তখন তারা একটি কথাই বলেন - আমরা দেশে শান্তি চাই, যাতে আমরা নিশ্চিন্তে দেশে বিনিয়োগ করতে পারি, পরিবার নিয়ে দেশে যেতে পারি। তারা কোনো দলের পক্ষে নয়, তারা স্থিতিশীলতার পক্ষে।

তাই পাঁচ আগস্টের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত - আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ব যেখানে আর কোনো প্রধানমন্ত্রীকে দেশ ছাড়তে হবে না, বরং তিনি জনগণের ভোটে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে সম্মানের সাথে বিদায় নেবেন। সেটাই হবে পাঁচ আগস্টের শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।


শরিফুল খান প্লাবন 
লেখক ও সাংবাদিক 

 

No comments found


News Card Generator