নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার গোয়ালাকান্দা ইউনিয়নের শালদিঘা গ্রামের দারুল আমান এতিমখানায় গত ২২ সেপ্টেম্বর সকালে ভয়াবহ এক খাদ্য বিষক্রিয়ার ঘটনা ঘটেছে। সরকারি ক্যাপিটেশন গ্র্যান্টপ্রাপ্ত এই এতিমখানায় প্রাতঃরাশ গ্রহণের পরপরই অন্তত ১৮ থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। আক্রান্তদের মধ্যে তীব্র ডায়রিয়া ও বমির উপসর্গ দেখা দিলে তাদের দ্রুত ময়মনসিংহের এসকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ঘটনার আকস্মিকতায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে এতিমখানাটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করে। সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়া এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ে জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। মূলত কী কারণে এই গণ-অসুস্থতা ঘটল এবং এর পেছনে কোনো গাফিলতি রয়েছে কি না, তা নিয়ে এখন স্থানীয় প্রশাসন ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের অভিযোগ, ২২ সেপ্টেম্বর সকালে শিশুদের যে খাবার পরিবেশন করা হয়েছিল তা মূলত আগের দিনের সংরক্ষিত বাসি খাবার ছিল। এতিমখানার খাবার ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের অস্বচ্ছতার বিষয়টি এবার চরম আকার ধারণ করেছে বলে দাবি করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, সরকারি অনুদান পাওয়ার পরও শিক্ষার্থীদের পাতে কেন বাসি খাবার দেওয়া হবে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একজন অভিভাবক অভিযোগ করেন, এতিমখানার খাবার মাননিয়ন্ত্রণহীন হওয়ার কারণেই শিশুরা এই পরিস্থিতির শিকার হয়েছে। রুটিনমাফিক খাবারের মান তদারকি না করায় এবং অর্থ সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহের প্রবণতা থেকেই এই বিপত্তি ঘটেছে বলে স্থানীয়দের ধারণা। শিক্ষার্থীদের তালিকা এবং সরকারি বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিয়ে যে প্রশ্ন দীর্ঘদিনের, এবার তা উন্মোচিত হয়েছে এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এতিমখানার পরিচালক ও তালিমাত-ই-ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার মাওলানা মুফতি আতাউল মোস্তফা রেজভী সুন্নী আল কাদরী অসুস্থতার কথা স্বীকার করলেও বাসি খাবার পরিবেশনের বিষয়টি সরাসরি এড়িয়ে গেছেন। তিনি দাবি করেছেন, নিরাপত্তার খাতিরেই প্রতিষ্ঠানটি সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে এবং বর্তমানে শিক্ষার্থীরা সুস্থ রয়েছে। তবে তার এই দায়সারা বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন এলাকাবাসী। এদিকে পূর্বধলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঘটনাটি সম্পর্কে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত নন, তবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসনিক অবহেলার পাশাপাশি এতিমখানাগুলোর নিয়মিত তদারকির অভাব যে কতটা প্রকট, এই ঘটনা তারই একটি নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। যথাযথ নজরদারি না থাকায় সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের খেয়ালখুশিমতো পরিচালনা করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এই ঘটনার পর সরকারি অনুদানের স্বচ্ছতা এবং এতিমখানা পরিচালনার নীতিমালা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি উপেক্ষা করে পরিচালিত এমন ব্যবস্থাপনা কেবল অমানবিকই নয়, বরং আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কেবল সাময়িক বন্ধ রাখা বা নামমাত্র তদন্তই যথেষ্ট নয়, বরং প্রতিটি এতিমখানার খাদ্য তালিকা ও ব্যবস্থাপনা কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় আনা জরুরি। জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহিতার আওতায় এনে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায়, সরকারি সহায়তায় পরিচালিত এতিমখানাগুলো কেবল অনুদান ভোগের কেন্দ্রে পরিণত হবে এবং শিক্ষার্থীদের জীবন প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে থাকবে।