বাংলাদেশের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির অধীনে ত্রাণ, ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এবং ভালনারেবল গ্রুপ ডেভেলপমেন্ট (ভিজিডি) বিতরণ কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব কর্মসূচি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখে। তবে, সম্প্রতি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই জনগুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম ও জালিয়াতির কালো থাবা বিস্তার করেছে, যা প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বঞ্চিত করে চলেছে। ডিলার নিয়োগ থেকে শুরু করে পণ্য বিতরণ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে, যা সরকারের মহৎ উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে।
টিসিবি, যা ন্যায্যমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করে বাজার স্থিতিশীল রাখতে সচেষ্ট, সেখানেও অনিয়মের চিত্র উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক সময়ে টিসিবির পণ্য কালোবাজারে বিক্রি, মজুদ করে রাখা এবং ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগে বেশ কিছু ডিলারের ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছে এবং জরিমানা করা হয়েছে। মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, রাজশাহী, নেত্রকোনা, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ এবং পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে টিসিবির পণ্য কালোবাজারে বিক্রির ঘটনা ধরা পড়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বরিশালে কালোবাজারে বিক্রির জন্য টিসিবির পণ্য মজুত করায় এক ডিলারকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এমনকি নোয়াখালীর কবিরহাটে টিসিবির পণ্য কালোবাজারে বিক্রি ও মজুদ রাখার অভিযোগে দুজনকে আটকও করা হয়েছে। এছাড়া, টিসিবির ডিলার নিয়োগেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সোনারগাঁও, রাজাপুর এবং নেত্রকোনার মদনে নীতিমালা লঙ্ঘন করে অযোগ্যদের ডিলারশিপ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, যেখানে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বাদ পড়েছেন। সবচেয়ে alarming তথ্য হলো, বিগত সময়ে এনআইডি জালিয়াতি করে একই পরিবারের একাধিক টিসিবি কার্ড তৈরি করা হয়েছিল এবং দুর্নীতির কারণে প্রায় ৩৭ লাখ কার্ড বাতিল করা হয়েছে, যা এই খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা ও ব্যাপক জালিয়াতির প্রমাণ।
ভিজিডি এবং ভিজিএফ কর্মসূচির চাল বিতরণেও দুর্নীতির চিত্র ভয়াবহ। অসহায় ও হতদরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত ভিজিএফের চাল বিতরণে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। মিহিরপুরের গাঙ্গি উপজেলার ধানখোলা ইউনিয়নে এক ব্যক্তির হাতে ৩৩টি কার্ড পাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বঞ্চিত করছে। কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ভিজিডি কার্ডের ৪৬৫ জন সুবিধাভোগীর মধ্যে ৫১ জন কার্ডধারীর একাধিক মাসের চাল আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে ১৩ মাসের চাল বিতরণের পরেও সুবিধাভোগীরা কার্ড হাতে পেয়েছেন। সাতক্ষীরার শ্যামনগরে ভিজিএফের চাল বিতরণে ১০ কেজির বদলে ৫ কেজি করে চাল দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নীলফামারীর সৈয়দপুরে এক ইউপি সদস্য ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে ভিজিডি কার্ডের চাল আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে, যেখানে তারা কার্ডধারীর অজান্তেই চাল উত্তোলন করেছেন। এমনকি মৃত নারীর ভিজিডি কার্ডের চাল আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর এক ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলে ভিজিডি কার্ডের চূড়ান্ত তালিকায় স্বজনপ্রীতি ও অর্থের বিনিময়ে অস্বচ্ছল মহিলাদের নাম বাদ দিয়ে সচ্ছল ও অযোগ্যদের অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাটোরের বিপ্রবেলঘড়িয়া ইউনিয়নেও ভিজিডি কার্ড বিতরণে স্বচ্ছল পরিবারকে কার্ড দেওয়া, টাকা নেওয়া এবং টাকা নিয়েও কার্ড না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ত্রাণ বিতরণেও অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান নিজেই স্বীকার করেছেন যে, মাঠপর্যায়ে টিআর, কাবিখা ইত্যাদি কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি শতভাগ দূর করা যায়নি। নারায়ণগঞ্জে সরকারি ত্রাণ আত্মসাৎ ও গুজব ছড়ানোর অভিযোগে একজন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। ফেনীতে সরকারি ত্রাণের টিন আত্মসাতের একটি মামলায় এক ব্যক্তিকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যেখানে একজন ইউপি চেয়ারম্যানও অভিযুক্ত ছিলেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য চেয়েছিল এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বারবার ত্রাণ বিতরণে কোনো ধরনের অনিয়ম-স্বজনপ্রীতি বরদাস্ত না করার কথা বলেছেন। তবে, এসব সতর্কবাণী সত্ত্বেও অনিয়ম অব্যাহত রয়েছে। এমনকি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচিতে (সিপিপি) নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে, যেখানে যোগ্য প্রার্থীদের নম্বর কমিয়ে দেওয়া বা উত্তরপত্র বদল করার মতো ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের (পিআইও) বিরুদ্ধে অব্যয়িত সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে, যার পরিমাণ প্রায় ১৫ কোটি টাকা। খাদ্য অধিদপ্তরেও বস্তা সরবরাহে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
এই দুর্নীতি ও অনিয়মের ফলে প্রকৃত দুস্থ ও অসহায় মানুষরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকারি সহায়তা যাদের জীবন বাঁচাতে পারে, তারাই এই দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন সরকারের জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকার ও প্রশাসনের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের একটি অংশের জড়িত থাকা এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে, কারণ তারাই তৃণমূল পর্যায়ে বিতরণের মূল দায়িত্বে থাকেন। এই পরিস্থিতি দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং দরিদ্রদের দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বের হতে বাধা দিচ্ছে।
সুপারিশ: ত্রাণ, টিসিবি ও ভিজিডি বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে একটি সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, টিসিবি, ভিজিডি ও ত্রাণ কর্মসূচির সকল সুবিধাভোগীর তালিকা ডিজিটাল পদ্ধতিতে তৈরি ও হালনাগাদ করতে হবে, যেখানে জাতীয় পরিচয়পত্র ও বায়োমেট্রিক যাচাই বাধ্যতামূলক হবে। দ্বিতীয়ত, ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কঠোর নজরদারি এবং নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো অযোগ্য ব্যক্তি যেন ডিলারশিপ না পায়। তৃতীয়ত, বিতরণ ব্যবস্থায় নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শনের সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, সে যে পর্যায়েরই কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধি হোক না কেন। দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) এসব অভিযোগের তদন্তে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে এবং তাদের ক্ষমতা ও জনবল বৃদ্ধি করতে হবে। চতুর্থত, স্থানীয় পর্যায়ে তদারকি কমিটিগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে এবং তাদের কার্যক্রমে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, অভিযোগ জানানোর জন্য একটি সহজ ও নিরাপদ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে, যেখানে অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিশেষে, এসব কর্মসূচির বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে সুবিধাভোগীরা তাদের অধিকার সম্পর্কে জানতে পারে এবং কোনো অনিয়ম দেখলে তা প্রতিবাদ করতে পারে।