বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) এবং হাইটেক পার্ক খাতে বিগত দেড় দশকে 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' রূপান্তরের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র কমিটি কর্তৃক প্রকাশিত ৪৭২ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে আইসিটি অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি), হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ এবং এটুআই (Aspire to Innovate) সহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পে স্বজনপ্রীতি, সিন্ডিকেশন ও আর্থিক লুটপাটের দলিলভিত্তিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই শ্বেতপত্র কেবল অভিযোগের তালিকা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ও জবাবদিহিহীনতার একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তদন্তে দেখা গেছে, নাগরিক সেবা সহজীকরণ ও প্রশাসনিক উদ্ভাবনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত 'এস্পায়ার টু ইনোভেট' (এটুআই) প্রকল্পটিকে রাজনৈতিক বয়ান তৈরির হাতিয়ার এবং ক্ষমতা-কেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্ল্যাটফর্মে পরিণত করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে বিপুল রাষ্ট্রীয় অর্থ নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ব্যয় করা হয়েছে। আটটি জেলায় আইটি ট্রেনিং ও ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন প্রকল্পে প্রায় ৫৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে জমি অধিগ্রহণ ও ভবন নির্মাণে অতিরিক্ত খরচ দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন প্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত অপচয়, অসংগতি, আর্থিক ক্ষতি, অসম চুক্তি, জনবল নিয়োগে অনিয়ম এবং একই কাজ বারবার করার মতো ঘটনা চিহ্নিত হয়েছে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জমি অধিগ্রহণ ও অবকাঠামো নির্মাণ করে মোটা অঙ্কের টাকা অপচয় করা হয়েছে। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) কার্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ছয়টি খাতে ৫০ কোটি ৫৮ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়েছে, যার মধ্যে নিজস্ব আয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত না করে অতিরিক্ত অনুদান গ্রহণ, ভাড়া অনাদায়ী থাকা এবং অন্যের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের মতো বিষয় রয়েছে।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আইসিটি বিভাগ ৫৩টি প্রকল্প ও ৩৪টি কর্মসূচিতে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এর বাইরে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগও ৪০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে। সব মিলিয়ে আইসিটি খাতে মোট ৬৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হলেও ডিজিটাল সেবা, দুর্নীতি কমানো, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আইসিটি সেবা রপ্তানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সমপর্যায়ের অর্থনীতির দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে আছে। প্রশিক্ষণের নামে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা ১১টি প্রকল্প ও ১৫টি কর্মসূচির সুফল মেলেনি, অনেক প্রশিক্ষকই প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অধিকারী ছিলেন না। মোবাইল গেমস ও অ্যাপস তৈরিতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হলেও অনেক অ্যাপই কাজে আসেনি। শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব প্রকল্পে ৬০০ কোটি টাকার অনিয়ম পেয়েছে অডিট অধিদপ্তর। এই বিপুল ব্যয়ের পরও দেশের আইসিটি খাত প্রত্যাশিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি, বরং দলীয় কিছু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির উন্নতি হয়েছে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
আইসিটি খাতের এই ভয়াবহ লুটপাট ও অনিয়ম তদন্তে অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিবিদ নিয়াজ আসাদুল্লাহর নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। এই টাস্কফোর্স ২৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে ভয়াবহ লুটপাট উদঘাটন করেছে এবং তাদের তদন্ত এখনো চলমান। আইসিটি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী জানিয়েছেন, অপ্রয়োজনীয় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার ব্যয় ইতোমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে এবং আরও ৫ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে দুটি বিদেশি অর্থায়িত প্রকল্প থেকে। বিশেষজ্ঞরা এই খাতের প্রধান বাধা হিসেবে সুপরিকল্পিত পরিকল্পনার অভাব, তাৎক্ষণিক সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা এবং উচ্চশিক্ষা ও শিল্প খাতের মধ্যে সংযোগহীনতাকে দায়ী করেছেন। হার্ডওয়্যার আমদানিতে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও দেশে সংযোজনের শর্ত না থাকায় সিংহভাগ অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে।
সুপারিশ: আইসিটি ও হাইটেক পার্ক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে শ্বেতপত্র কমিটির সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা উচিত। সকল প্রকল্পের বিস্তারিত অডিট ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি। প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাতিল করে অর্থের অপচয় রোধ করতে হবে। এছাড়া, দেশীয় হার্ডওয়্যার উৎপাদন ও সংযোজনে উৎসাহ দিতে নীতি সহায়তা এবং উচ্চশিক্ষা ও শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় স্থাপন করে দক্ষ জনবল তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।