জাতীয় পরিচয়পত্র ও নির্বাচন কমিশনে দুর্নীতির কালো ছায়া: তথ্য ফাঁস ও অনিয়মের জালে নাগরিক সেবা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জাতীয় পরিচয়পত্র ও নির্বাচন কমিশনে দুর্নীতির কালো ছায়া: তথ্য ফাঁস ও অনিয়মের জালে নাগরিক সেবা

শাহরিয়ার কবির  avatar   
শাহরিয়ার কবির
জাতীয় পরিচয়পত্র ও নির্বাচন কমিশনে দুর্নীতির কালো ছায়া: তথ্য ফাঁস ও অনিয়মের জালে নাগরিক সেবা
জাতীয় পরিচয়পত্র ও নির্বাচন কমিশনে দুর্নীতির কালো ছায়া: তথ্য ফাঁস ও অনিয়মের জালে নাগরিক সেবা
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ডাটাবেস সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম ও তথ্য ফাঁসের ঘটনায় জর্জরিত। নাগরিক সেবার এই...

বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ডাটাবেস সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম ও তথ্য ফাঁসের ঘটনায় জর্জরিত। নাগরিক সেবার এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটি এখন বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটে ভুগছে, যেখানে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত হয়রানি ও দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন। সাম্প্রতিক বিভিন্ন তদন্ত ও অভিযানে এনআইডি সেবায় ঘুষ লেনদেন, তথ্য জালিয়াতি এবং ব্যক্তিগত ডেটা পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগের সত্যতা বেরিয়ে এসেছে, যা দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সুশাসনের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।

জাতীয় পরিচয়পত্র সেবার ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত বছর (২০২৫ সালের ২৩ জুন) দেশের ১৩টি জেলা নির্বাচন অফিসে একযোগে অভিযান চালায়। এনআইডি প্রস্তুত, সংশোধন ও বিতরণে অনিয়ম, দুর্নীতি ও হয়রানির অভিযোগে এই অভিযান পরিচালিত হয়। রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, নওগাঁ, বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ এবং জামালপুর জেলার নির্বাচন অফিসগুলোতে নাগরিকদের কাছ থেকে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ ওঠে। এর আগে, ২০২৪ সালের ২০ ডিসেম্বর, দুদক জাতীয় পরিচয়পত্রের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও কার্ড প্রিন্ট সেবার নামে ঘুষ লেনদেনের সময় হাতেনাতে কয়েকজনকে আটক করে। এই ঘটনায় একটি নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যেখানে কম্পিউটার দোকানদার, আনসার সদস্য, দালাল, এমনকি নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারাও জড়িত ছিলেন। এনআইডি মহাপরিচালক তখন জড়িত ইসি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেন। এছাড়া, ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা নির্বাচন অফিসের একজন অফিস সহকারীকে নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। এসব ঘটনা এনআইডি সেবার প্রতিটি স্তরে দুর্নীতির গভীর শিকড় প্রমাণ করে।

এনআইডি ডাটাবেসের নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি, নির্বাচন কমিশন প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পায় যে, ইসির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ পাঁচটি প্রতিষ্ঠান তৃতীয় পক্ষের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ফাঁস করেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ইউসিবি ব্যাংকের উপায়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আইবাস। ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, এসব প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিস (শোকজ) দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে চুক্তি বাতিলের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। এর ধারাবাহিকতায়, ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি, অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এনআইডি কার্ড জালিয়াতি ও নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের একজন কম্পিউটার অপারেটর-কাম-অফিস সহকারী (হাবীবুল্লাহ) সহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে। তারা অত্যাধুনিক প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি এবং তথ্য বিক্রির নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রতি মাসে কোটি টাকা আয় করত বলে অভিযোগ রয়েছে। হাবীবুল্লাহ ২০১৩ সাল থেকে নির্বাচন কমিশন অফিসে কর্মরত ছিলেন এবং ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসে বদলি হন। একই ধরনের ঘটনায়, ২০২৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর, র‌্যাব আব্দুস সালাম সরকার নামে এক যুবককে সার্ভার হ্যাক করে এনআইডি ও সিমের তথ্য বিক্রির অভিযোগে গ্রেপ্তার করে, যিনি নির্বাচন অফিসের অস্থায়ী কর্মচারী ছিলেন। সম্প্রতি, ২০২৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর, জানা যায় যে, একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ইউজার আইডি, পাসওয়ার্ড এবং ওটিপি ব্যবহার করে এনআইডি সার্ভারের তথ্য অনৈতিকভাবে সংশোধন ও স্থানান্তর করা হচ্ছে। এই ঘটনাগুলো দেশের কোটি কোটি নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।

নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগও নতুন নয়। ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর, সরকার কর্তৃক গঠিত 'জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন' (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে) বিগত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংঘটিত বিভিন্ন দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য চেয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এই কমিশন, যা সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন-এর নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে, নাগরিকদের সরাসরি, ই-মেইল বা ডাকযোগে অভিযোগ জানানোর সুযোগ দিয়েছে। যদিও নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ ২০২৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি মন্তব্য করেছেন যে, বর্তমান পদ্ধতিতে ভোটার তালিকা নিয়ে জালিয়াতির সুযোগ নেই, কারণ এটি কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত ও ক্রস-চেক করা হয়, তবে মৃত ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দিতে ব্যর্থতা একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়াও, ২০২৫ সালের ১৯ মার্চ, নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকায় ঢুকে পড়া রোহিঙ্গাদের শনাক্ত ও বাদ দিতে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনের (ইউএনএইচসিআর) সার্ভারের সহায়তা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো অতীতের অনিয়মের তদন্ত ও ভবিষ্যতের নির্বাচনকে স্বচ্ছ করার প্রচেষ্টার অংশ।

সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে সব ধরনের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সিকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি তথ্য-প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো এবং সাইবার অপরাধ কঠোরভাবে মোকাবিলা করার ওপর জোর দেন। এই নির্দেশের প্রেক্ষাপটে, ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর, 'ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৬' প্রকাশিত হয়েছে, যা ব্যক্তিগত তথ্যের সংগ্রহ, ব্যবহার ও প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে ব্যক্তির অধিকার ও তথ্যের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেয়। তবে, ২০২৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর, সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের আলোচনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো মানহানিকর বক্তব্যের কারণে কারাদণ্ডের বিধান রাখার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে। এছাড়াও, ২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর, ডিপফেক জালিয়াতির চেষ্টা গত তিন বছরে ২,১৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যা ডিজিটাল বায়োমেট্রিক নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

সুপারিশ: নির্বাচন কমিশন ও এনআইডি ডাটাবেসের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং এই খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো জরুরি। প্রথমত, এনআইডি তথ্য ফাঁস ও জালিয়াতির ঘটনায় জড়িত সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়। দ্বিতীয়ত, এনআইডি ডাটাবেসের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা (সিকিউরিটি অডিট) পরিচালনা করতে হবে। তৃতীয়ত, এনআইডি সেবা প্রদানে দালাল চক্র ও অসাধু কর্মকর্তাদের দৌরাত্ম্য বন্ধে কঠোর নজরদারি ও অভ্যন্তরীণ তদন্ত জোরদার করতে হবে এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও দ্রুত করতে হবে। চতুর্থত, জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশনের সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে এবং ভবিষ্যতে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সকল প্রকার অনিয়ম রোধে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পরিশেষে, নবপ্রণীত ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনীতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নাগরিক অধিকারও সুরক্ষিত থাকে।


🔎 অনুসন্ধানে: শাহরিয়ার কবির

শাহরিয়ার কবির, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: নির্বাচন কমিশন ও এনআইডি ডাটাবেস।

没有找到评论


News Card Generator