চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: স্বয়ংক্রিয়তার যুগে মানবসম্পদের পুনর্বিন্যাস | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: স্বয়ংক্রিয়তার যুগে মানবসম্পদের পুনর্বিন্যাস

আরিফুর রহমান  avatar   
আরিফুর রহমান
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: স্বয়ংক্রিয়তার যুগে মানবসম্পদের পুনর্বিন্যাস
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: স্বয়ংক্রিয়তার যুগে মানবসম্পদের পুনর্বিন্যাস
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (WEF) কর্তৃক প্রকাশিত 'ফিউচার অফ জবস রিপোর্ট ২০২৩' অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮৩ মিলিয়ন কর্মসংস্থান বিলুপ্ত...

সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (WEF) কর্তৃক প্রকাশিত 'ফিউচার অফ জবস রিপোর্ট ২০২৩' অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮৩ মিলিয়ন কর্মসংস্থান বিলুপ্ত হতে পারে, যেখানে নতুন করে ৬৯ মিলিয়ন কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই পরিসংখ্যান চতুর্থ শিল্প বিপ্লব (4IR) দ্বারা চালিত স্বয়ংক্রিয়তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ব্যাপক প্রভাবের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশের মতো দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এই বৈশ্বিক প্রবণতা একাধারে বিশাল চ্যালেঞ্জ এবং অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। বাংলাদেশের শ্রমবাজার ইতিমধ্যেই কৃষি থেকে শিল্প ও সেবা খাতে স্থানান্তরিত হচ্ছে, এবং 4IR এই রূপান্তরের গতিকে আরও তীব্র করবে। বিশেষ করে, ডেটা এন্ট্রি, প্রশাসনিক সহায়তা, এবং উৎপাদন খাতের পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো স্বয়ংক্রিয়তার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে, যা দেশের বিপুল সংখ্যক কর্মীর জন্য নতুন করে দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করছে। একই সময়ে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং বিশেষজ্ঞ, ডেটা অ্যানালিস্ট, রোবটিক্স ইঞ্জিনিয়ার এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতো উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন পেশার চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, দেশের মানবসম্পদকে ভবিষ্যতের উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য একটি সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী কৌশল গ্রহণ অপরিহার্য, যেখানে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়তার যুগে টিকে থাকার এবং সমৃদ্ধ হওয়ার পথ তৈরি হবে।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (TVET) খাত, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিজেদের পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। যদিও এই প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়, তবে এর গতি ও ব্যাপ্তি এখনও কাঙ্ক্ষিত স্তরে পৌঁছায়নি। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণের নির্দেশনা দিয়েছে, কিন্তু এর বাস্তবায়ন এখনও ধীর। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখনও সনাতন পাঠ্যক্রমে আটকে আছে, যা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা যেমন - ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং, সমস্যা সমাধান, ডেটা অ্যানালিটিক্স, এবং ডিজিটাল লিটারেসি প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) দক্ষতা উন্নয়নের জন্য একটি জাতীয় কাঠামো তৈরি করেছে এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার অধীনে পরিচালিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলোকে সমন্বয় করার চেষ্টা করছে। তবে, শিল্প খাতের চাহিদা এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মধ্যে একটি বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। শিল্প মালিকরা প্রায়শই অভিযোগ করেন যে, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীরা বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিয়ে আসে না। এই ব্যবধান পূরণের জন্য শিল্প ও একাডেমিয়ার মধ্যে নিবিড় সহযোগিতা অপরিহার্য, যেখানে পাঠ্যক্রম প্রণয়ন থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ মডিউল ডিজাইন পর্যন্ত উভয় পক্ষের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বিশেষ করে, উদীয়মান প্রযুক্তি যেমন ব্লকচেইন, ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT), এবং ক্লাউড কম্পিউটিং-এর উপর প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি করা জরুরি, যা দেশের তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করবে।

দেশের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ খাতের উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো Skills for Employment Investment Program (SEIP)। SEIP প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানকে অর্থায়ন করা হচ্ছে যাতে তারা শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা প্রশিক্ষণ দিতে পারে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ইতোমধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষকে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তবে গুণগত মান এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গতি বিধানের ক্ষেত্রে আরও মনোযোগ প্রয়োজন। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় (TVET) শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে, কিন্তু মোট শিক্ষার্থীর তুলনায় এটি এখনও কম। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যেমন - নতুন ট্রেড কোর্স চালু করা এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। কিন্তু, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক ল্যাব সুবিধা, প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং শিল্প-সংশ্লিষ্ট পাঠ্যক্রমের অভাব এখনও প্রকট। উদাহরণস্বরূপ, AI, রোবটিক্স বা অ্যাডভান্সড ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মতো ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং বিশেষজ্ঞ শিক্ষকের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়, বিদেশি প্রযুক্তি অংশীদারদের সাথে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির প্রবর্তন অপরিহার্য। পাশাপাশি, শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত রিফ্রেশার ট্রেনিং এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইন্টার্নশিপের সুযোগ তৈরি করা উচিত যাতে তারা সর্বশেষ প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন। শুধু তাই নয়, শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং উদ্যোক্তা মানসিকতা বিকাশের উপর জোর দিতে হবে, কারণ স্বয়ংক্রিয়তার যুগে কেবল চাকরি খোঁজা নয়, চাকরি তৈরি করার সক্ষমতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

খাত/দক্ষতা ২০২০ সালের চাহিদা (আনুমানিক) ২০২৫ সালের প্রক্ষেপিত চাহিদা (আনুমানিক) পরিবর্তনের হার (%)
ডেটা অ্যানালিস্ট ও সায়েন্টিস্ট ১০০,০০০ ১৫০,০০০ +৫০%
AI ও মেশিন লার্নিং বিশেষজ্ঞ ২৫,০০০ ৭০,০০০ +১৮০%
রোবটিক্স ইঞ্জিনিয়ার ১০,০০০ ৩০,০০০ +২০০%
ডিজিটাল মার্কেটিং ও স্ট্র্যাটেজি বিশেষজ্ঞ ৮০,০০০ ১৩০,০০০ +৬২.৫%
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ২০,০০০ ৪৫,০০০ +১২৫%
ডেটা এন্ট্রি ক্লার্ক ৫০০,০০০ ২০০,০০০ -৬০%
অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ও এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি ৪০০,০০০ ২৫০,০০০ -৩৭.৫%
উৎপাদন ও অ্যাসেম্বলি কর্মী (সাধারণ) ১,০০০,০০০ ৬০০,০০০ -৪০%

উৎস: ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের 'ফিউচার অফ জবস রিপোর্ট ২০২৩' এবং বাংলাদেশ শ্রমবাজারের প্রাসঙ্গিক উপাত্তের উপর ভিত্তি করে তৈরি প্রক্ষেপণ।

সুপারিশ

  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এর যৌথ উদ্যোগে, প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি বাধ্যতামূলক '4IR পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ নির্দেশিকা' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এই নির্দেশিকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, রোবটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা এবং ব্লকচেইন-এর মতো উদীয়মান প্রযুক্তির উপর কমপক্ষে ৩০% কোর্স ক্রেডিট অন্তর্ভুক্ত করা এবং প্রতি দুই বছর অন্তর পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা ও আপডেটের জন্য একটি নির্দিষ্ট কমিটি গঠন করা।
  • কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এবং Skills for Employment Investment Program (SEIP)-এর অধীনে দেশের সকল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আগামী তিন বছরের মধ্যে 'স্মার্ট ল্যাব' স্থাপন করতে হবে, যেখানে অত্যাধুনিক CNC মেশিন, 3D প্রিন্টার, রোবোটিক আর্ম এবং IoT ডিভাইস থাকবে। এই ল্যাবগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য শিল্প খাতের সাথে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেলের অধীনে চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে, যেখানে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিতভাবে ল্যাবের আধুনিকীকরণ ও প্রশিক্ষক সরবরাহে সহায়তা করবে।
  • বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS)-এর মাধ্যমে প্রতি বছর 'জাতীয় দক্ষতা চাহিদা জরিপ' পরিচালনা বাধ্যতামূলক করতে হবে, যা শ্রমবাজারের পরিবর্তনশীল চাহিদা এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রভাব সম্পর্কে রিয়েল-টাইম তথ্য সরবরাহ করবে। এই জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে NSDA এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) কে তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং পাঠ্যক্রম অবিলম্বে সংশোধনের জন্য একটি নির্দিষ্ট 'নীতি প্রতিক্রিয়া প্রক্রিয়া' (Policy Response Mechanism) প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা প্রতি ছয় মাসে একবার পর্যালোচনা করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আরিফুর রহমান

আরিফুর রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator