গ্রামীণ জনপদে টেলিমেডিসিন: ইন্টারনেট অবকাঠামো বনাম স্বাস্থ্যসেবার অধিকার | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

গ্রামীণ জনপদে টেলিমেডিসিন: ইন্টারনেট অবকাঠামো বনাম স্বাস্থ্যসেবার অধিকার

ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা  avatar   
ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা
গ্রামীণ জনপদে টেলিমেডিসিন: ইন্টারনেট অবকাঠামো বনাম স্বাস্থ্যসেবার অধিকার
গ্রামীণ জনপদে টেলিমেডিসিন: ইন্টারনেট অবকাঠামো বনাম স্বাস্থ্যসেবার অধিকার
ছবি: সংগৃহীত

২০২৩ সালের ওয়ার্ল্ড ব্যাংক প্রকাশিত 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট: রিকভারি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স' প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলে স্...

২০২৩ সালের ওয়ার্ল্ড ব্যাংক প্রকাশিত 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট: রিকভারি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স' প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার ডিজিটাল রূপান্তরে টেলিমেডিসিনের সম্ভাবনা অপরিসীম হলেও, ইন্টারনেট অবকাঠামোর দুর্বলতা এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে একটি বড় প্রতিবন্ধক। বিশেষ করে, দেশের প্রায় ৩৫% গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এখনও উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধার বাইরে, যা স্বাস্থ্যসেবার অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। গত এক দশকে টেলিমেডিসিন পরিষেবা চালুর সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগগুলো প্রশংসনীয় হলেও, প্রান্তিক পর্যায়ের নাগরিকদের কাছে এর সুফল পৌঁছে দিতে অবকাঠামোগত বৈষম্য একটি মৌলিক প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রবর্তিত 'স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩' এবং বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিকে টেলিমেডিসিন পরিষেবা প্রদানের পাইলট প্রকল্পগুলো প্রাথমিক সাফল্য দেখিয়েছে। তবে, এই প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা মূলত নির্ভর করে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের উপর। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) তাদের 'কান্ট্রি পার্টনারশিপ স্ট্র্যাটেজি ফর বাংলাদেশ (২০২১-২০২৫)' নথিতে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ইন্টারনেট অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিলেও, গ্রামীণ এলাকায় ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের গতি এখনও ধীর। ফলে, একজন গ্রামীণ চিকিৎসককে প্রায়শই নিম্নমানের ভিডিও কল বা ডেটা বিভ্রাটের মধ্যে দিয়ে রোগীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়, যা সঠিক রোগ নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে মারাত্মক ত্রুটি সৃষ্টি করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একজন ডায়াবেটিস রোগীর নিয়মিত রক্তচাপ বা গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণের ডেটা তাৎক্ষণিকভাবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পৌঁছাতে না পারলে, চিকিৎসার মান ব্যাহত হয় এবং জরুরি স্বাস্থ্য পরামর্শ পেতে বিলম্ব ঘটে। শহরের হাসপাতালগুলোতে যেখানে উচ্চগতির ইন্টারনেট সহজলভ্য, সেখানে গ্রামীণ ক্লিনিকগুলোতে এই সুবিধা প্রায়শই অনুপস্থিত, যা স্বাস্থ্যসেবার ডিজিটাল বিভেদকে আরও প্রকট করে তুলছে।

গ্রামীণ জনপদে টেলিমেডিসিন পরিষেবা সম্প্রসারণের পথে কেবল ইন্টারনেট অবকাঠামোই একমাত্র বাধা নয়; ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের অভাবও একটি বড় সমস্যা। বাংলাদেশ সরকার 'তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ'-এর মাধ্যমে গ্রামীণ অঞ্চলে ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন করলেও, সেগুলোর কার্যকারিতা এবং স্বাস্থ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের সচেতনতা এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক তাদের 'ডিজিটাল ইকোনমি ফর ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ' এর আওতায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ডিজিটাল লিটারেসি বাড়ানোর উপর জোর দিলেও, বাংলাদেশে বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতের কর্মীদের জন্য সুনির্দিষ্ট, নিয়মিত ও আপডেটেড প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অভাব রয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কাররা টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারের প্রাথমিক জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও, প্রযুক্তিগত জটিলতা বা ডিভাইস রক্ষণাবেক্ষণে অনভিজ্ঞতার কারণে পরিষেবা প্রদানে হিমশিম খাচ্ছেন। এটি শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা নয়, বরং স্বাস্থ্যসেবার অধিকারের সাথে জড়িত একটি সামাজিক ও শিক্ষাগত চ্যালেঞ্জ, যা নিরসনে সমন্বিত প্রচেষ্টা অত্যাবশ্যক।

সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২
গ্রামীণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (%) ৩৮% ৪৫% ৫২%
গ্রামীণ টেলিমেডিসিন কেন্দ্র (সংখ্যা) ২৫০ ৩৩০ ৪০০
গ্রামীণ ফাইবার অপটিক কভারেজ (%) ২০% ২৫% ৩০%
স্বাস্থ্যকর্মীদের ডিজিটাল প্রশিক্ষণপ্রাপ্তি (%) ১৫% ২২% ২৮%

উৎস: বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, World Bank ডেটা।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে 'জাতীয় টেলিমেডিসিন কৌশলপত্র ২০২০' এর আওতায় একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে, যেখানে আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে উচ্চগতির ফাইবার অপটিক ইন্টারনেট সংযোগ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ ও সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার, World Bank এবং ADB-এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায়, 'জাতীয় স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট' এর মাধ্যমে গ্রামীণ স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার, ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক টুলস পরিচালনা এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে বাধ্যতামূলক ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে হবে, যার জন্য 'জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ২০১১' এর আলোকে একটি সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি করা হবে।
  • বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কে 'টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১ (সংশোধিত ২০১০)' এর অধীনে গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী অপারেটরদের জন্য মানসম্মত ব্যান্ডউইথ নিশ্চিতকরণ এবং সুলভ মূল্যে পরিষেবা প্রদানের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে, যাতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্যসেবার অধিকার হিসেবে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট অ্যাক্সেস পায়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা

ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator