সম্প্রতি, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে 'ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ' (UHC) অর্জনের লক্ষ্যে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনায় হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিন সেবার সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এই পরিকল্পনায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, যা দীর্ঘকাল ধরে অবহেলিত গ্রামীণ জনপদে স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে যখন বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের প্রবণতা বাড়ছে এবং বাংলাদেশও এই যাত্রায় পিছিয়ে থাকতে চাইছে না।
গ্রামীণ বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার ডিজিটাল রূপান্তর শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণেরও প্রচেষ্টা। বিশ্বব্যাংকের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে যেখানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার প্রায় ৭০ শতাংশ, সেখানে গ্রামীণ অঞ্চলে এই হার এখনও ৪০ শতাংশের নিচে, যা ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। এই বৈষম্য নিরসনে বাংলাদেশ সরকার এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) যৌথভাবে 'ই-হেলথ স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান' নিয়ে কাজ করছে, যার মূল লক্ষ্য হলো প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য সরঞ্জাম সহজলভ্য করা। এই কৌশলগত পরিকল্পনায় মোবাইল স্বাস্থ্য অ্যাপ, রিমোট ডায়াগনস্টিকস এবং টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্মগুলোকে গ্রামীণ স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যাতে রোগীরা ঘরে বসেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করতে পারেন। এটি শুধু চিকিৎসা ব্যয়ই কমাবে না, বরং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সহায়তা করবে, যা মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমাতেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ কেবল অবকাঠামো নির্মাণেই সীমাবদ্ধ নয়, এর জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম জনবল তৈরি করা। দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবে ভুগছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন এনজিও এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে 'ডিজিটাল লিটারেসি ক্যাম্পেইন' পরিচালনা করছে। এর পাশাপাশি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গ্রামীণ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছে, যা তাদের ডিজিটাল স্বাস্থ্য সরঞ্জাম পরিচালনায় দক্ষ করে তুলছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় এ পর্যন্ত প্রায় ৫,০০০ স্বাস্থ্যকর্মীকে স্মার্টফোন এবং ট্যাবলেট ব্যবহারের মাধ্যমে রোগীদের তথ্য সংগ্রহ, ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড (EMR) সংরক্ষণ এবং দূরবর্তী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সাথে যোগাযোগ স্থাপনে পারদর্শী করে তোলা হয়েছে। এই উদ্যোগগুলো গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় আধুনিক প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ডিজিটাল স্বাস্থ্য ইকোসিস্টেম তৈরির পথ প্রশস্ত করবে।
| সূচক | ২০২০ | ২০২১ | ২০২২ | ২০২৩ |
|---|---|---|---|---|
| গ্রামীণ অঞ্চলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (শতাংশ) | ৩২% | ৩৪% | ৩৭% | ৪০% |
| টেলিমেডিসিন ব্যবহারকারী (লাখ) | ৩.৫ | ৫.২ | ৭.৮ | ১০.৫ |
| কমিউনিটি ক্লিনিকে ডিজিটাল ডিভাইস বিতরণ (সংখ্যা) | ১,২০০ | ২,১০০ | ৩,৫০০ | ৫,০০০ |
| স্বাস্থ্যকর্মী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত (সংখ্যা) | ১,০০০ | ২,৫০০ | ৪,০০০ | ৫,৫০০ |
উৎস: বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিশ্বব্যাংক (২০২৩ সালের ডেটা প্রক্ষেপণ)।
সুপারিশ
- গ্রামীণ অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট অবকাঠামো সম্প্রসারণের জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগকে 'ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্স' এর অধীনে একটি সুনির্দিষ্ট বাজেট ও সময়সীমা নির্ধারণ করে 'গ্রামীণ ব্রডব্যান্ড সম্প্রসারণ প্রকল্প' দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
- স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে 'জাতীয় ই-হেলথ নীতিমালা'র আওতায় গ্রামীণ স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে হবে, যার জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এবং বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
- বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন'-এর অধীনে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা প্যাকেজ চালু করতে হবে এবং এই সেবার প্রচার ও প্রসারে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে (যেমন ইউনিয়ন পরিষদ) সক্রিয়ভাবে জড়িত করতে হবে।