সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয় প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২৩ অনুযায়ী, বিগত দশকে দেশে পেস্টিসাইডের ব্যবহার প্রায় ২০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা একদিকে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হলেও, অন্যদিকে খাদ্য নিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে, শস্য উৎপাদনে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অব্যবস্থাপনা এবং এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) কর্তৃক উদ্ভাবিত নতুন নতুন উচ্চফলনশীল জাতের শস্য উৎপাদন বৃদ্ধির যে ধারা আমরা দেখছি, সেখানে এই পেস্টিসাইড ব্যবহারের লাগামহীনতা ভবিষ্যতের খাদ্য সুরক্ষাকে কতটা টেকসই রাখবে, তা এখন বড় প্রশ্ন।
খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করলেও, এই অগ্রগতির পেছনে থাকা পেস্টিসাইড নির্ভরতা একটি নীরব ঝুঁকি তৈরি করছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এর তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে দেশে কীটনাশক আমদানি ও ব্যবহার উভয়ই ঊর্ধ্বমুখী। যেখানে ২০০৫ সালে হেক্টর প্রতি গড় কীটনাশক ব্যবহার ছিল প্রায় ২০০ গ্রাম, সেখানে ২০২২ সালে তা ৩০০ গ্রাম ছাড়িয়ে গেছে। এই বৃদ্ধি মূলত ধান, আলু, সবজি ও ফল চাষে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কৃষকদের মধ্যে সচেতনতার অভাব, সহজলভ্যতা এবং তাৎক্ষণিক ফল লাভের আশায় অনেক সময় মাত্রাতিরিক্ত বা অননুমোদিত পেস্টিসাইড ব্যবহার করা হয়। এর ফলে মাটি, পানি ও বায়ুদূষণ বাড়ছে, যা শুধু পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে না, বরং মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জীবনচক্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অধিকন্তু, খাদ্যপণ্যে পেস্টিসাইডের অবশিষ্টাংশ (residue) জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে, যা ক্যান্সার, স্নায়ুতন্ত্রের রোগ এবং প্রজননগত সমস্যার কারণ হতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এই বিষয়ে নিয়মিত গবেষণা পরিচালনা করলেও, মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন ও তদারকি এখনো দুর্বল।
পেস্টিসাইড ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো সমন্বিত বালাই দমন (Integrated Pest Management - IPM) পদ্ধতির অপ্রতুল ব্যবহার। যদিও কৃষি মন্ত্রণালয় IPM পদ্ধতিকে উৎসাহিত করার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, তবে কৃষকদের মধ্যে এর গ্রহণযোগ্যতা এবং ব্যবহার এখনও সীমিত। অনেক কৃষক পুরোনো পদ্ধতিতে পেস্টিসাইড ব্যবহারে অভ্যস্ত, যা তাদের জন্য সময় ও শ্রম সাশ্রয়ী মনে হয়, যদিও দীর্ঘমেয়াদে এটি পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। DAE এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মাত্র ৩০-৩৫% কৃষক কোনো না কোনো মাত্রায় IPM পদ্ধতি অনুসরণ করেন, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল অন্তত ৫০%। এর পাশাপাশি, পেস্টিসাইডের মান নিয়ন্ত্রণ এবং বিপণন ব্যবস্থায়ও দুর্বলতা রয়েছে। বাজারে অনেক সময় নিম্নমানের বা মেয়াদোত্তীর্ণ পেস্টিসাইড বিক্রি হয়, যা শুধু অকার্যকরই নয়, বরং আরও বেশি পরিবেশগত ক্ষতি সাধন করে। এই অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থা এবং দুর্বল তদারকি খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি। BARC এর গবেষকরা বহু বছর ধরে জৈব বালাইনাশক ও জৈব সারের কার্যকারিতা নিয়ে কাজ করছেন এবং বেশ কিছু কার্যকর প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন, কিন্তু বাণিজ্যিকীকরণ ও কৃষকদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা বিদ্যমান।
| পেস্টিসাইড সম্পর্কিত তথ্য (২০১৮-২০২২) | ২০১৮ | ২০১৯ | ২০২০ | ২০২১ | ২০২২ |
|---|---|---|---|---|---|
| মোট ব্যবহৃত পেস্টিসাইডের পরিমাণ (টন) | ৪৩,৫০০ | ৪৫,২০০ | ৪৭,১০০ | ৪৯,৮০০ | ৫২,৩০০ |
| প্রতি হেক্টর কৃষি জমিতে পেস্টিসাইড ব্যবহার (গ্রাম) | ২৭০ | ২৭৫ | ২৮৫ | ২৯৫ | ৩০৫ |
| IPM পদ্ধতি অনুসরণকারী কৃষকের শতকরা হার | ২৫% | ২৭% | ৩০% | ৩২% | ৩৪% |
| পেস্টিসাইড অবশিষ্টাংশযুক্ত খাদ্যপণ্যের নমুনা (শনাক্তকৃত %) | ১৫% | ১৬% | ১৭% | ১৮% | ১৯% |
উৎস: কৃষি মন্ত্রণালয়, DAE এবং BARC এর সমন্বিত প্রতিবেদন।
সুপারিশ
- কৃষি মন্ত্রণালয়কে 'পেস্টিসাইড অধ্যাদেশ, ১৯৮৩' এবং 'পেস্টিসাইড বিধিমালা, ১৯৮৫' এর আধুনিকীকরণ ও কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে অননুমোদিত পেস্টিসাইডের বিক্রয় ও ব্যবহার বন্ধে DAE এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে নিয়মিত বাজার তদারকি ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ক্ষমতা বাড়াতে হবে।
- BARI, BRRI এবং BARC কর্তৃক উদ্ভাবিত পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তি, যেমন - জৈব বালাইনাশক, জৈব সার এবং আইপিএম (Integrated Pest Management) পদ্ধতির সম্প্রসারণ ও কৃষকদের কাছে সহজলভ্য করার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়কে একটি সুনির্দিষ্ট বাজেট ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে কৃষকদের জন্য বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনী খামারের ব্যবস্থা থাকবে।
- খাদ্যপণ্যে পেস্টিসাইডের অবশিষ্টাংশ নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI) এর সাথে সমন্বয় করে কৃষি মন্ত্রণালয়কে নিয়মিত মনিটরিং ও টেস্টিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে এবং এর ফলাফল জনসম্মুখে প্রকাশ করার জন্য একটি স্বচ্ছ ডাটাবেস তৈরি করতে হবে।