ক্ষয়ক্ষতি তহবিল ও বাংলাদেশের প্রত্যাশা: শুধু কি প্রতিশ্রুতিতেই আটকে? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ক্ষয়ক্ষতি তহবিল ও বাংলাদেশের প্রত্যাশা: শুধু কি প্রতিশ্রুতিতেই আটকে?

রেজাউন নবী  avatar   
রেজাউন নবী
ক্ষয়ক্ষতি তহবিল ও বাংলাদেশের প্রত্যাশা: শুধু কি প্রতিশ্রুতিতেই আটকে?
ক্ষয়ক্ষতি তহবিল ও বাংলাদেশের প্রত্যাশা: শুধু কি প্রতিশ্রুতিতেই আটকে?
ছবি: সংগৃহীত
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বা ক্ষয়ক্ষতি তহবিল প্রতিষ্ঠার বহু প্রতীক্ষিত সিদ্ধান্তটি গত বছর সংযুক্ত ...

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বা ক্ষয়ক্ষতি তহবিল প্রতিষ্ঠার বহু প্রতীক্ষিত সিদ্ধান্তটি গত বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত COP28 সম্মেলনে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। সম্মেলনের প্রথম দিনেই এই তহবিল কার্যকরের ঘোষণা আসে এবং তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি প্রাথমিক অঙ্গীকার জমা পড়ে, যার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ১০০ মিলিয়ন ডলার, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২৭৫ মিলিয়ন ডলার, যুক্তরাজ্য ২০ মিলিয়ন ডলার, যুক্তরাষ্ট্র ১৭.৫ মিলিয়ন ডলার এবং জাপান ১০ মিলিয়ন ডলার প্রদানের ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য, যারা দশকের পর দশক ধরে এই তহবিলের জন্য সোচ্চার ছিল, এটি নিছকই একটি আর্থিক প্রতিশ্রুতি ছিল না, বরং জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রথম ধাপ হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে, এই প্রাথমিক উদ্দীপনার পর এক বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে, এবং প্রশ্ন জাগছে: এই তহবিল কি কেবল প্রতিশ্রুতির বেড়াজালে আটকা পড়বে, নাকি বাংলাদেশের কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশের সুরক্ষায় এটি বাস্তব অর্থেই ভূমিকা রাখতে পারবে?

বাংলাদেশের মতো ব-দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো যুগ যুগ ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের চরম মূল্য দিয়ে আসছে, যদিও বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে তাদের অবদান নগণ্য। বিগত বছরগুলোতে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো বাংলাদেশের কৃষি খাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কোটি কোটি টাকার ফসলহানি ঘটছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে সরাসরি আঘাত হানছে এবং খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) জলবায়ু সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে, কিন্তু তাদের গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন প্রায়শই অপ্রতুল থেকে যায়। এই প্রেক্ষাপটে, ক্ষয়ক্ষতি তহবিলের মূল উদ্দেশ্য হলো সেইসব অপূরণীয় ক্ষতিপূরণ প্রদান করা, যা অভিযোজন বা প্রশমন প্রচেষ্টার মাধ্যমেও এড়ানো সম্ভব নয়। কিন্তু তহবিলের আকার, অর্থায়ন প্রক্রিয়া এবং পরিচালনা কাঠামো নিয়ে এখনও অনেক অনিশ্চয়তা রয়েছে, যা এর কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় তৈরি করছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের তত্ত্বাবধানে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে পরিচালিত হলেও, একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ পরিচালনা পর্ষদের অভাব এবং তহবিলের অর্থায়নের জন্য উন্নত দেশগুলোর উপর নির্ভরতা এর দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো, বিশেষ করে ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্র এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলো, সরাসরি তহবিলের অর্থ অ্যাক্সেস করার জন্য একটি সহজ এবং দ্রুত প্রক্রিয়া আশা করছে, যা বিদ্যমান জটিল বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন ব্যবস্থার থেকে ভিন্ন হবে।

ক্ষয়ক্ষতি তহবিলের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার জন্য শুধু অর্থ সংগ্রহই যথেষ্ট নয়, বরং এর সুষম ও কার্যকর বিতরণ প্রক্রিয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, পরিবেশ মন্ত্রণালয় জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত জাতীয় নীতি ও কৌশল প্রণয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এই তহবিল থেকে প্রাপ্ত অর্থ কীভাবে কৃষি খাতে সর্বোচ্চ উপযোগিতা নিশ্চিত করবে, তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উদাহরণস্বরূপ, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাত (যেমন BRRI ধান ৬৭, BRRI ধান ৯৭) এবং অন্যান্য ফসলের (যেমন BARI উদ্ভাবিত লবণাক্ততা সহনশীল ভুট্টা ও সূর্যমুখী) গবেষণা ও সম্প্রসারণে আরও বড় আকারের বিনিয়োগ প্রয়োজন। একইভাবে, খরাপ্রবণ অঞ্চলে সেচ ব্যবস্থার উন্নতি এবং খরা সহনশীল জাতের বীজ বিতরণ DAE-এর মাধ্যমে আরও বিস্তৃত পরিসরে করা উচিত। এই প্রকল্পগুলোর জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে ক্ষয়ক্ষতি তহবিল একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে, তবে এর জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী সমন্বয় এবং বাস্তবায়ন কাঠামো থাকা আবশ্যক। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে, অভিযোজন তহবিলের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন না পাওয়ার অভিযোগ বহুদিনের। ক্ষয়ক্ষতি তহবিল যেন সেই একই ফাঁদে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির সঠিক মূল্যায়ন এবং সেই অনুযায়ী অর্থায়নের আবেদন প্রস্তুত করা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কাজ। BARC-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করতে পারে, যা আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের দাবিকে আরও জোরালো করবে। তহবিলের অর্থায়ন প্রক্রিয়া যেন শুধু বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রান্তিক কৃষক ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখে, সেদিকেও বিশেষ নজর রাখতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কৃষি খাতের ক্ষয়ক্ষতি (আনুমানিক বার্ষিক) প্রভাবিত এলাকা/খাত প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ (আনুমানিক)
লবণাক্ততা বৃদ্ধি ২.৫-৩.০ মিলিয়ন টন ধান উৎপাদন হ্রাস দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলীয় জেলাসমূহ $৫০-৭০ মিলিয়ন (লবণাক্ততা সহনশীল জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে)
বন্যা ও জলাবদ্ধতা ১.৫-২.০ মিলিয়ন হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মধ্যাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চল $৮০-১০০ মিলিয়ন (বন্যা সহনশীল জাত, উন্নত নিষ্কাশন ব্যবস্থা)
খরা ০.৫-১.০ মিলিয়ন টন ফসলহানি উত্তরাঞ্চল ও বরেন্দ্র অঞ্চল $৩০-৫০ মিলিয়ন (খরা সহনশীল জাত, সেচ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ)
ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস $২০০-৩০০ মিলিয়ন আর্থিক ক্ষতি উপকূলীয় জেলাসমূহ $৬০-৮০ মিলিয়ন (ঘূর্ণিঝড় সহনশীল অবকাঠামো, আগাম সতর্কতা)

উৎস: পরিবেশ মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের বিভিন্ন প্রতিবেদন ও গবেষণা (২০২০-২০২৩)

সুপারিশ

  • জলবায়ু পরিবর্তন জনিত ক্ষয়ক্ষতি তহবিল থেকে অর্থ প্রাপ্তি ও বিতরণে স্বচ্ছতা এবং কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় বাস্তবায়নকারী সংস্থা (National Implementing Entity - NIE) প্রতিষ্ঠা করা, যা DAE, BARI, BRRI এবং BARC-এর সাথে সরাসরি সমন্বয় করে কৃষি খাতের প্রকল্পগুলো দ্রুত অনুমোদন ও অর্থায়ন করতে পারবে।
  • জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট কৃষি ও পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ভুলভাবে নিরূপণের জন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয় একটি "জাতীয় জলবায়ু ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন নীতি" (National Climate Loss Assessment Policy) প্রণয়ন করবে, যেখানে BARC-এর বৈজ্ঞানিক গবেষণা, DAE-এর মাঠ পর্যায়ের তথ্য এবং BRRI ও BARI-এর ফসল উৎপাদন সংক্রান্ত উপাত্ত ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ক্ষয়ক্ষতির একটি বিস্তারিত ডেটাবেস তৈরি করা হবে।
  • ক্ষয়ক্ষতি তহবিল থেকে প্রাপ্ত অর্থ দ্রুত ও কার্যকরভাবে প্রান্তিক কৃষকদের কাছে পৌঁছানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক-এর তত্ত্বাবধানে একটি "জলবায়ু সহনশীল কৃষি তহবিল" (Climate Resilient Agriculture Fund) গঠন করা, যার মাধ্যমে BRRI এবং BARI-এর উদ্ভাবিত জলবায়ু সহনশীল ফসলের বীজ উৎপাদন ও বিতরণে DAE-কে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও ভর্তুকি নিশ্চিত করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রেজাউন নবী

রেজাউন নবী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জলবায়ু অর্থায়ন ও গ্রিন ফান্ড। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator