বাংলাদেশের কৃষি খাত দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে সার, বীজ ও কৃষি ভর্তুকি বিতরণে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। কৃষকদের জন্য সরকারের মহৎ উদ্যোগগুলো একশ্রেণির অসাধু চক্রের কারণে ভেস্তে যাচ্ছে, যার ফলস্বরূপ প্রকৃত কৃষক বঞ্চিত হচ্ছেন এবং তাদের ঋণের বোঝা বাড়ছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে এসব অনিয়মের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়েছে, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগগুলো বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪০ হাজার কৃষি যন্ত্র বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দুদক দেশব্যাপী অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে দেখা গেছে, একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে কৃষি যন্ত্র বিতরণ করা হয়েছে, এমনকি একজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরিবারের সদস্যদের নামও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় ৩৮ লাখ টাকা মূল্যের কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ধরা পড়ে, যেখানে অধিকাংশ গ্রাহকের আবেদনপত্রে তথ্যের গরমিল ছিল। প্রকৃত কৃষকের বদলে অন্য ব্যক্তিকে যন্ত্র প্রদান, যন্ত্রের দাম তিনগুণ বেশি আদায়, নিম্নমানের যন্ত্র সরবরাহ এবং একই যন্ত্র একাধিকবার বিক্রি দেখিয়ে ভর্তুকি আত্মসাতের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এই প্রকল্প, যার মাধ্যমে সরকার ৩ হাজার ২০ কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি সহায়তা দিচ্ছে, তা অসাধু কর্মকর্তা, যন্ত্র সরবরাহকারী কোম্পানি ও স্থানীয় দালালদের যোগসাজশে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে।
সার ও বীজ বিতরণে অনিয়মও কৃষকদের দুর্দশা বাড়িয়ে তুলছে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে নাটোরের সিংড়ায় সরকারি প্রণোদনার সার-বীজ প্রকৃত কৃষকদের হাতে পৌঁছানোর আগেই বিক্রি হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই মাসে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে কৃষি ভর্তুকি বিতরণে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে ইউএনও কর্তৃক চাল ও অর্থ বিতরণ স্থগিত করা হয়। সেখানে সাবেক বিএনপি কাউন্সিলর ও যুবদল নেতাদের মতো অকৃষকদের 'কৃষক' হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের নভেম্বরে চাঁদপুরের কচুয়ায় প্রকৃত ও দরিদ্র কৃষকরা বিনামূল্যে সার-বীজ থেকে বঞ্চিত হন। অভিযোগ উঠেছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগসাজশে ভুয়া তালিকা তৈরি করে প্রণোদনার সার-বীজ ডিলারদের কাছে কম দামে বিক্রি করে দেন, যা কৃষকদের চড়া দামে কিনতে হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১২০ জন কৃষকের জন্য বরাদ্দকৃত ২.৪ মেট্রিক টন সার ও ৬০০ কেজি আউশ ধানের বীজ দোকানে বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনায় এক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় এবং তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় আউশ প্রণোদনা বিতরণে প্রান্তিক কৃষকদের নাম বাদ দিয়ে সার-বীজ পাচারের অভিযোগ ওঠে, যা স্থানীয়দের হাতে ধরা পড়ে এবং বিতরণ স্থগিত করা হয়।
এই দুর্নীতি শুধু মাঠ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, এর শেকড় মন্ত্রণালয় পর্যন্ত বিস্তৃত। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কৃষিঋণ, কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ভর্তুকি এবং ধান-চাল কেনাসহ কৃষির প্রায় প্রতিটি খাতে ব্যাপক দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে। কৃষকদের কৃষিঋণ পেতে ব্যাংক কর্মকর্তাদের ঘুষ দিতে হয়েছে বলেও শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কৃষি মন্ত্রণালয়ে ১০৯ জনের পদোন্নতির পাশাপাশি শতাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের দুর্নীতি তদন্ত চলমান থাকার খবর প্রকাশিত হয়। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ১০টি উদ্ভিদ সংগনিরোধ ল্যাবরেটরিকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করার প্রকল্পে ১৫৬ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়, যেখানে ৬৯ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ১১১ কোটি টাকায় কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া, নওগাঁয় কৃষি মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা লঙ্ঘন করে একজন সরকারি কলেজ প্রভাষক ও একজন কৃষি কর্মকর্তা অবৈধভাবে সার ও বীজের ডিলারশিপ নিয়েছেন এবং তাদের স্বজনদেরও একই সুবিধা পাইয়ে দিয়েছেন।
এই অনিয়ম ও দুর্নীতি কৃষকদের জন্য মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনছে। তারা একদিকে সরকারের দেওয়া ভর্তুকি ও প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে চড়া দামে সার-বীজ কিনে চাষাবাদ করতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। কৃষি অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে কৃষক প্রশিক্ষণ, মাঠ দিবস, কৃষি যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকি এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বরাদ্দসহ বিভিন্ন খাতের মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনা কৃষকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করছে এবং কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। কৃষিমন্ত্রী নিজেও ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতিকে কোনো রকম প্রশ্রয় না দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, কিন্তু মাঠ পর্যায়ের চিত্র ভিন্ন।
সুপারিশ: কৃষি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে একটি স্বাধীন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা উচিত, যা সার, বীজ ও কৃষি ভর্তুকি বিতরণের প্রতিটি ধাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) কৃষি খাতের দুর্নীতির তদন্তে আরও সক্রিয় ও কঠোর হতে হবে এবং দোষী ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকদের তালিকা প্রণয়নে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার এবং বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকদের চিহ্নিত করা অপরিহার্য। এছাড়া, কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের অবৈধ ডিলারশিপ বা অন্য কোনো অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা স্বচ্ছ করতে হবে এবং তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। কৃষকদের অভিযোগ জানানোর জন্য একটি সহজলভ্য ও কার্যকর হেল্পলাইন চালু করা এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা উচিত।