কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও শ্রম আইন: 'সুস্থ কর্মপরিবেশ' প্রতিষ্ঠায় নিয়োগকর্তার দায়বদ্ধতা কতটুকু?

অ্যাডভোকেট তানিয়া  avatar   
অ্যাডভোকেট তানিয়া
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও শ্রম আইন: 'সুস্থ কর্মপরিবেশ' প্রতিষ্ঠায় নিয়োগকর্তার দায়বদ্ধতা কতটুকু?
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও শ্রম আইন: 'সুস্থ কর্মপরিবেশ' প্রতিষ্ঠায় নিয়োগকর্তার দায়বদ্ধতা কতটুকু?
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) এর অধীনে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, বিশেষ করে কোভিড-১৯ পরবর্...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) এর অধীনে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, বিশেষ করে কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে যখন কর্মজীবীদের মধ্যে মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং হতাশার হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর সাম্প্রতিক এক যৌথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রায় ১৯% প্রাপ্তবয়স্ক কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কর্মজীবীরা। এই পরিসংখ্যান একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, কর্মপরিবেশের চাপ এবং মানসিক স্বাস্থ্য একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কযুক্ত বিষয়। বিশেষত, পোশাক শিল্প এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মতো উচ্চচাপের কর্মক্ষেত্রগুলোতে কর্মীদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা নিয়োগকর্তাদের জন্য একটি নৈতিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এই বিষয়ে নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে, তবে বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান।

বাংলাদেশের শ্রম আইনে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও, মানসিক স্বাস্থ্য প্রায়শই উপেক্ষিত থেকে যায়। শ্রম আইন, ২০০৬ এর ধারা ৪৮ (স্বাস্থ্যবিধি) এবং ধারা ৪৯ (কর্মপরিবেশ) শারীরিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার উপর জোর দিলেও, মানসিক স্বাস্থ্যের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা বা সুরক্ষার ব্যবস্থা অস্পষ্ট। ফলস্বরূপ, কর্মীরা মানসিক চাপ বা হয়রানির শিকার হলেও আইনি প্রতিকার পেতে সমস্যার সম্মুখীন হন। উদাহরণস্বরূপ, কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাজের চাপ, হয়রানি, বা বৈষম্যের কারণে সৃষ্ট মানসিক আঘাতকে সাধারণত 'পেশাগত রোগ' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না, যা বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫ এর তফসিল-২ এ তালিকাভুক্ত পেশাগত রোগের আওতার বাইরে। ডিরেক্টরেট জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসেস (DGHS) এবং ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে মানসিক অসুস্থতার কারণে উৎপাদনশীলতা হ্রাস, কর্মবিরতি এবং কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। এটি শুধু কর্মীদের ব্যক্তিগত জীবনকেই প্রভাবিত করছে না, বরং সামগ্রিকভাবে জাতীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নিয়োগকর্তারা প্রায়শই মানসিক স্বাস্থ্যকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন, যা একটি সুস্থ কর্মপরিবেশ তৈরির পথে প্রধান বাধা। অথচ, একটি স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ কেবল শারীরিক নিরাপত্তাই নয়, মানসিক স্থিতিশীলতাও অন্তর্ভুক্ত করে।

নিয়োগকর্তার দায়বদ্ধতা কেবল আইনগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটেও বিচার্য। শ্রম আইন, ২০০৬ এর ধারা ১৫১ এবং ১৫২ অনুযায়ী, নিয়োগকর্তাকে কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখতে হবে এবং কোনো দুর্ঘটনা বা পেশাগত রোগের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে পেশাগত রোগ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ায়, ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীরা ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যকে পেশাগত স্বাস্থ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আইনের সংস্কার জরুরি। ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (DGDA) মানসিক স্বাস্থ্য সেবার জন্য প্রয়োজনীয় ঔষধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করলেও, কর্মক্ষেত্রে এই সেবা প্রাপ্তি এখনও একটি দূরবর্তী স্বপ্ন। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কর্মসূচি (Employee Assistance Program - EAP) বা কাউন্সেলিং সেবার ব্যবস্থা করে না। এর ফলে, কর্মীরা তাদের মানসিক সমস্যাগুলো নিরসনে প্রয়োজনীয় সমর্থন পান না, যা তাদের কর্মদক্ষতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। নিয়োগকর্তাদের উচিত কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা, মানসিক চাপ মোকাবিলার কৌশল শেখানো এবং প্রয়োজনে পেশাদার কাউন্সেলিং সেবার ব্যবস্থা করা। এতে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের আনুগত্যও বাড়বে।

সংস্থা/প্রতিষ্ঠান তথ্য/পরিসংখ্যান সাল/সময়কাল
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) ও WHO প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্তের হার: ১৯% ২০১৮-২০১৯
ডিরেক্টরেট জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসেস (DGHS) কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপজনিত অসুস্থতার কারণে উৎপাদনশীলতা হ্রাস: প্রায় ১৫-২০% ২০২১-২০২২ (আনুমানিক)
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় (বাংলাদেশ) শ্রম আইনে মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট ধারার অভাব ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮)
ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (DGDA) মানসিক স্বাস্থ্য ঔষধের প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণের নির্দেশিকা জারি ২০২০

উৎস: জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ডিরেক্টরেট জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসেস, বাংলাদেশ শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদন ও নির্দেশিকা।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) এর ধারা ৪৮ ও ৪৯ এবং বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫ এর তফসিল-২ সংশোধন করে 'মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা'কে 'পেশাগত রোগ' হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং কর্মক্ষেত্রে মানসিক হয়রানি ও অতিরিক্ত চাপকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করার জন্য সুস্পষ্ট বিধান প্রণয়ন করা।
  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এবং ডিরেক্টরেট জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসেস (DGHS) এর যৌথ উদ্যোগে একটি জাতীয় কর্মক্ষেত্র মানসিক স্বাস্থ্য নীতিমালা (National Workplace Mental Health Policy) প্রণয়ন করা, যেখানে নিয়োগকর্তাদের জন্য কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাধ্যতামূলক EAP (Employee Assistance Program) বা পেশাদার কাউন্সেলিং সেবা প্রদানের নির্দেশিকা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এবং ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) এর তত্ত্বাবধানে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিরূপণ এবং প্রতিরোধের জন্য নিয়মিত গবেষণা ও জরিপ পরিচালনা করা এবং এর ফলাফলের ভিত্তিতে নিয়োগকর্তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও সচেতনতামূলক কর্মশালার আয়োজন করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট তানিয়া

অ্যাডভোকেট তানিয়া 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও শ্রম আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator