সম্প্রতি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) কর্তৃক প্রকাশিত 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি ২০২১'-এর অগ্রগতি প্রতিবেদনে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (TVET) থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান এবং শিল্পের চাহিদার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ব্যবধানের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের শিল্প খাত, বিশেষ করে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনগুলোর সাথে তাল মেলাতে সক্ষম দক্ষ জনবলের তীব্র সংকটে ভুগছে, অথচ প্রতি বছর হাজার হাজার কারিগরি শিক্ষার্থী সনদ নিয়ে কর্মবাজারে প্রবেশ করছে। এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন শিল্পের উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করছে, তেমনি অন্যদিকে শিক্ষিত বেকারত্বের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলছে। এই প্রেক্ষাপটে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার পাঠ্যক্রমকে শিল্পের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা পূরণে সক্ষম করে তুলতে এর আধুনিকীকরণ এখন আর কেবল একটি ভালো উদ্যোগ নয়, বরং একটি অপরিহার্য প্রয়োজন।
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারগুলোর বর্তমান পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এগুলোর একটি বড় অংশ এখনও পুরোনো প্রযুক্তি ও পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। যেমন, পোশাক শিল্পে অত্যাধুনিক অটোমেশন ও রোবোটিক্সের ব্যবহার বাড়লেও, অনেক কারিগরি প্রতিষ্ঠানে এখনও সনাতন সেলাই মেশিন বা ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ার ওপর অধিক জোর দেওয়া হয়। একইভাবে, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো উদীয়মান ক্ষেত্রগুলোতে দক্ষ জনবলের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও, অধিকাংশ কারিগরি পাঠ্যক্রম এই বিষয়গুলোকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয়নি। এর ফলে, শিক্ষার্থীরা পাস করে বের হলেও শিল্প কারখানায় তাদের নতুন করে প্রশিক্ষণ দিতে হচ্ছে, যা নিয়োগকর্তাদের জন্য সময় ও অর্থ উভয়ই ব্যয়বহুল। এই অদক্ষতা শেষ পর্যন্ত দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
BANBEIS-এর তথ্য অনুযায়ী, কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়লেও, তাদের মানসম্পন্ন কর্মসংস্থানের হার আশানুরূপ নয়। দেশের নির্মাণ শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প এবং সেবা খাতগুলোতেও আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। উদাহরণস্বরূপ, কৃষিক্ষেত্রে ড্রোন প্রযুক্তি, স্মার্ট ফার্মিং এবং স্বয়ংক্রিয় সেচ ব্যবস্থার প্রচলন হলেও, কারিগরি কৃষিশিক্ষার পাঠ্যক্রমে এর প্রতিফলন অত্যন্ত সীমিত। এই ব্যবধানের কারণে, শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শই বিদেশ থেকে দক্ষ জনবল আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের পাশাপাশি স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত করছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য, পাঠ্যক্রম প্রণয়নের সময় শিল্পের প্রতিনিধিদের সাথে নিয়মিত ও কার্যকর সংলাপ স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে শিক্ষার্থীরা এমন দক্ষতা অর্জন করতে পারে যা সরাসরি কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য। এটি কেবল শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগই বাড়াবে না, বরং দেশের শিল্প খাতকেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত হতে সাহায্য করবে।
| খাত | ২০২০-২১ অর্থবছর (লক্ষ) | ২০২১-২২ অর্থবছর (লক্ষ) | ২০২২-২৩ অর্থবছর (লক্ষ) | শিল্পে দক্ষতার ব্যবধান (২০২৩) |
|---|---|---|---|---|
| কারিগরি শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থী | ১৭.৮ | ২০.১ | ২২.৫ | |
| শিল্পে নিয়োগকৃত (কারিগরি) | ৮.২ | ৯.৫ | ১০.৮ | ৪০% |
| তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা | ১.৫ | ২.২ | ৩.১ | ৬০% |
| পোশাক শিল্পে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র পরিচালনা | ০.৮ | ১.০ | ১.২ | ৫০% |
উৎস: BANBEIS, NSDA ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-এর সম্মিলিত প্রতিবেদন
সুপারিশ
- জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে 'কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা আইন, ২০১৮' এর আওতায় একটি নতুন প্রবিধানমালা তৈরি করবে, যা প্রতি দুই বছর অন্তর শিল্পের প্রতিনিধিদের (যেমন, বিজিএমইএ, বেসিস, বিআইডব্লিউটিএ) সাথে পরামর্শ করে পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ বাধ্যতামূলক করবে এবং এর বাস্তবায়ন তদারকির জন্য একটি 'শিল্প-শিক্ষা সমন্বয় সেল' গঠন করবে।
- কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, UGC এবং NSDA যৌথভাবে একটি 'জাতীয় দক্ষতা মান কাঠামো' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে, যেখানে প্রতিটি কারিগরি কোর্সের জন্য শিল্পের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট দক্ষতা ও জ্ঞান নির্ধারণ করা থাকবে, এবং এই মানদণ্ডের ভিত্তিতেই পলিটেকনিক ও ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটগুলোর পাঠ্যক্রম অনুমোদিত হবে।
- শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, 'জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০'-এর কারিগরি শিক্ষা সংক্রান্ত ধারাসমূহের আলোকে, কারিগরি শিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক শিল্প-প্রশিক্ষণ ও রিফ্রেশার কোর্স চালু করবে, যা শিক্ষকদের আধুনিক শিল্প প্রযুক্তির সাথে পরিচিত করে তুলবে এবং এর জন্য বার্ষিক বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করবে।