এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ

আনিসুর রহমান  avatar   
আনিসুর রহমান
এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ
এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ
ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে অস্থিরতা নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর অস্ব...

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে অস্থিরতা নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং কয়লা সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। গত অর্থবছরে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়েছে পেট্রোবাংলাকে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও লোডশেডিংয়ে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রায়শই পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে, জ্বালানি মিশ্রণে এলএনজি ও কয়লার উপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কৌশলগত দুর্বলতা এখন স্পষ্ট।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে গত এক দশকে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে, যেখানে দেশীয় গ্যাসের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে এলএনজি এবং কয়লাকে প্রধান বিকল্প হিসেবে দেখা হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং পেট্রোবাংলা, এই কৌশলগত পরিবর্তনে নেতৃত্ব দিয়েছে। ২০০৯ সালের বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা থেকে শুরু করে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় একটি অংশ কয়লা এবং পরবর্তীতে এলএনজি-নির্ভর করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা এই বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছে। বিশেষত, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে, ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধের পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, তা এলএনজি স্পট মার্কেটের মূল্যকে আকাশচুম্বী করে তোলে। ফলে, বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য উচ্চমূল্যে এলএনজি কেনা কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়, যার ফলস্বরূপ বহু এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয় এবং তীব্র লোডশেডিংয়ের মুখে পড়ে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির বাইরে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি সংগ্রহের ঝুঁকির দিকটি অত্যন্ত স্পষ্ট করে তুলেছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপরও মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। যদিও পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে বিশ্বজুড়ে কয়লার ব্যবহার কমানোর প্রবণতা রয়েছে, বাংলাদেশ এখনও তার জ্বালানি মিশ্রণে কয়লাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে। পায়রা, রামপাল এবং মাতারবাড়ীর মতো বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে, এই কেন্দ্রগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় কয়লার পুরোটাই আমদানি করতে হয়, যা আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের উপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক সময়ে ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মতো প্রধান কয়লা রপ্তানিকারক দেশগুলোতে উৎপাদন বিঘ্ন এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কয়লার দাম বেড়েছে। বিশ্বব্যাংক বারবার নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে সরে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানালেও, প্রাথমিক বিনিয়োগের উচ্চতা এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উপরন্তু, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পরিবেশগত প্রভাব, বিশেষ করে কার্বন নিঃসরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে এই প্রকল্পগুলোর জন্য অর্থায়ন প্রাপ্তি কঠিন করে তুলতে পারে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর এখন একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল প্রণয়ন করা জরুরি, যা একাধারে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং পরিবেশগত লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ করবে।

জ্বালানি আমদানির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। যখন বিশ্ববাজারে এলএনজি ও কয়লার দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়, তখন বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পায়। এই অতিরিক্ত ব্যয় হয় ভর্তুকি আকারে সরকার বহন করে, যা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের উপর চাপ সৃষ্টি করে, অথবা বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে ভোক্তার উপর চাপানো হয়, যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়। এই দ্বিমুখী চাপ থেকে মুক্তি পেতে হলে জ্বালানি মিশ্রণে বৈচিত্র্য আনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। যদিও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রাথমিক বিনিয়োগ বেশি, দীর্ঘমেয়াদে এর পরিচালন ব্যয় কম এবং এটি পরিবেশবান্ধব। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের জন্য বিভিন্ন ঋণ ও অনুদান কর্মসূচী চালু রেখেছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ হতে পারে। দেশের বিদ্যুৎ খাতকে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা প্রদান করতে হলে কেবল আমদানিনির্ভর জ্বালানির উপর আস্থা না রেখে অভ্যন্তরীণ উৎস এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এখন সময়ের দাবি।

সাল মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা (মেগাওয়াট) এলএনজি/গ্যাসভিত্তিক সক্ষমতা (%) কয়লাভিত্তিক সক্ষমতা (%) নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা (%) আমদানিকৃত বিদ্যুতের অংশ (%)
২০১৪ ১০,৮০০ ৬১% ৩% ১% ৪%
২০১৯ ২২,০০০ ৫৬% ৭% ১.৫% ৬%
২০২২ ২৫,৫০০ ৫২% ১১% ২% ৭%
২০২৩ (প্রাক্কলিত) ২৬,৫০০ ৫০% ১৩% ২.৫% ৭.৫%

উৎস: বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি সংশোধিত জ্বালানি মিশ্রণ কৌশল প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ কমপক্ষে ২০% এ উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকবে। এর জন্য 'সৌর বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্মসূচী' এবং 'বায়ু বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা' এর আওতায় বৃহৎ আকারের প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে।
  • পেট্রোবাংলাকে দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি সরবরাহ চুক্তিগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করতে হবে এবং একাধিক উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য নতুন চুক্তি সম্পাদন করতে হবে, যাতে বিশ্ববাজারের অস্থিরতার প্রভাব কমানো যায়। একই সাথে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বাপেক্স এর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন ব্লকগুলোতে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা ও বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
  • বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এর সহায়তায় বিদ্যমান অদক্ষ ও পরিবেশ দূষণকারী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা কম কার্বন নিঃসরণকারী প্রযুক্তিতে রূপান্তরের জন্য একটি 'জাস্ট ট্রানজিশন ফান্ড' প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার এই রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো এবং প্রণোদনা প্যাকেজ তৈরি করবে, যা বিদ্যুৎ খাতে কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব হ্রাস করতে সহায়ক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আনিসুর রহমান

আনিসুর রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator