বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত মেগা প্রকল্পগুলো প্রায়শই দুর্নীতির কালো ছায়ায় ঢাকা পড়ে। এমনই একটি হতাশাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে দেশের পূর্বাঞ্চলে বাস্তবায়নাধীন 'পূর্বাচল-রূপগঞ্জ জাতীয় মহাসড়ক সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ' প্রকল্পে। প্রাথমিকভাবে জনগণের যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগান্তকারী পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি নিয়ে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি এখন দীর্ঘসূত্রিতা, মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিম্নমানের কাজের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। আই নিউজ বিডি-র অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, কীভাবে একটি শক্তিশালী টেন্ডার সিন্ডিকেট, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশ এই জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পকে লুটেরাদের আখড়ায় পরিণত করেছে, যা প্রকারান্তরে দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে থাকা সত্ত্বেও, এই প্রকল্পের বেহাল দশা সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
আমাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, 'পূর্বাচল-রূপগঞ্জ জাতীয় মহাসড়ক সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ' প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে দুর্নীতির জাল বিছানো হয়েছে। বিশেষ করে টেন্ডার প্রক্রিয়াকে জিম্মি করে রেখেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সরকারি ক্রয় আইন, ২০০৬ (Public Procurement Act, 2006) এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা, ২০০৮ (Public Procurement Rules, 2008) এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার জমা দেওয়ার সময় অন্য যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভয়ভীতি দেখিয়ে সরে যেতে বাধ্য করা হয় অথবা উচ্চমূল্যে সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সাব-কন্ট্রাক্ট নিতে বাধ্য করা হয়। এর ফলে প্রতিযোগিতামূলক দরপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায়ও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে, যেখানে স্থানীয় প্রভাবশালীদের যোগসাজশে জমির দাম কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে, যা সাধারণ জনগণের জন্য ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার পরিবর্তে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেট ভরছে। ঠিকাদার নিয়োগের পর দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে, যাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে কমিশন আদায় করা।
প্রকল্পের কাজ শুরুর পর থেকেই দেখা গেছে দফায় দফায় সময় বৃদ্ধি এবং বাজেট সংশোধনের হিড়িক। প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় থেকে প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে বর্তমানে এই প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকায়। অথচ কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে শুরু থেকেই। রাস্তার কার্পেটিং, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং সেতু-কালভার্ট নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রকৌশলীরা। অনেক স্থানে রাস্তা নির্মাণের কয়েক মাসের মধ্যেই ফাটল দেখা দিয়েছে বা দেবে গেছে। সওজ-এর প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি এবং মনিটরিং টিমের কার্যকর তদারকির অভাবে ঠিকাদাররা ইচ্ছেমতো কাজ করছে। ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা, নকশা পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে প্রকল্পের কাজ বারবার থমকে যাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। দীর্ঘদিনের নির্মাণকাজের কারণে ধুলো-বালি, যানজট এবং শব্দ দূষণ নিত্যদিনের ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এই বৃহৎ প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির পেছনে সরকারি সংস্থাগুলোর দুর্বল তদারকি এবং জবাবদিহিতার অভাবই প্রধান কারণ। পরিকল্পনা কমিশন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর মতো সংস্থাগুলোর কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে দুর্নীতিবাজরা পার পেয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত কিছু অসাধু কর্মকর্তা সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগসাজশ করে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করছেন। প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য যেসকল নীতি ও আইন রয়েছে, সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। ফলে জনগণের করের টাকা অপচয় হচ্ছে এবং দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এই পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে সরকারের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করছে।
এই প্রকল্পের করুণ দশা শুধুমাত্র আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক ভাবমূর্তির ওপর। বিশ্বব্যাংক, এডিবি-সহ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা যখন বাংলাদেশের মেগা প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখাচ্ছে, তখন এমন অনিয়ম তাদের আস্থা কমাতে পারে। জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অপরিহার্য। যদি এই প্রবণতা চলতে থাকে, তবে দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্পগুলোও একই ভাগ্য বরণ করতে পারে, যা ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে বাধাগ্রস্ত করবে। এই অবস্থায় অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে, উন্নয়নের নামে প্রহসন চলতে থাকবে এবং এর দায়ভার বহন করতে হবে গোটা জাতিকে।
সুপারিশ: এই ধরনের মেগা প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো জরুরি: ১. সরকারি ক্রয় আইন, ২০০৬ এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা, ২০০৮ এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং টেন্ডার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। ২. প্রকল্প তদারকির জন্য একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে, যেখানে প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ এবং নিরীক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি নিরপেক্ষ দল থাকবে। ৩. ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে হবে এবং জমির প্রকৃত মালিকদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। ৪. প্রকল্পের প্রতিটি ধাপের বিস্তারিত তথ্য, যেমন- বাজেট, সময়সীমা, ঠিকাদারের নাম, কাজের অগ্রগতি ইত্যাদি জনগণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে (পাবলিক ডিসক্লোজার)। ৫. দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-কে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন করে মেগা প্রকল্পের দুর্নীতি তদন্তে বিশেষ সেল গঠন করতে হবে এবং জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। ৬. প্রকল্পের মান নিয়ন্ত্রণে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং নিয়মিত গুণগত মান পরীক্ষা (Quality Control) নিশ্চিত করতে হবে। ৭. প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।