শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, সাতক্ষীরা:
সুন্দরবনের নদ-নদীতে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আগামী পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে মাছ ও কাঁকড়া ধরার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলেরা। এই সময় জেলেরা পুরোদমে জাল মেরামত এবং নৌকা প্রস্তুত করার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ, কৈখালী ও রমজাননগর এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, চুনা, চুনকুড়ি, মালঞ্চ ও খোলপেটুয়া নদীর ধারে জেলেরা পুরোনো নৌকা রং করা এবং ছেঁড়া জাল মেরামতের কাজে মগ্ন। তাদের মুখে আনন্দের ঝিলিক দেখা যাচ্ছে, কারণ দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে।
শ্যামনগর উপজেলার জেলে পাড়ার পরিমল সরদারের মতে, 'জাল মেরামত না করলে নদীতে নামা সম্ভব নয়। এছাড়াও, এখনকার নদী আগের মতো সহজ নয়। জলজঙ্গলের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয় সবসময়ই থাকে।' তিনি আরও বলেন, 'ছোটবেলা থেকে মাছ ধরার পেশায় জড়িত, তাই সুন্দরবনে যাওয়ার আগে নৌকাতে আলকাতরা দিচ্ছি এবং জাল মেরামত করছি।' তার মতো আরও অনেকেই তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।
নীলডুমুর এলাকায় ওয়াহেদ গাজী বলেন, 'যখন থেকে বুঝতে শিখেছি তখন থেকে বাদাই (সুন্দরবনে) মাছ-কাঁকড়া ধরার কাজে জড়িত।' তিনি উল্লেখ করেন, 'বছরের দুটি সময় মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে, তখন আমাদের অন্য কাজ করে সংসার চালাতে হয়। মাছ ধরা শুরুর আগে ঋণ করে নৌকা মেরামত ও জাল কিনে নদীতে নামি। তবে মাছ পাওয়ার বিষয়টি আল্লাহর ওপর নির্ভর করে।'
জেলেরা আশাবাদী যে এবারের মৌসুমে নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যাবে। তবে তারা এটাও বলছেন, গত বছরের তুলনায় এবছর জ্বালানি খরচ এবং জাল-নৌকার মেরামতের খরচ বেড়েছে। জেলে আকবর মালী, মজিদ সরদার, হানিফ গাজী, ইদ্রীস গাজী, আল মামুন মালী জানান, তিন মাস সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া আহরণ বন্ধ থাকায় তাদের সংসার অনেক কষ্টে চলেছে। তারা আশা করছেন যে সুন্দরবনে মাছ পাওয়ার আশা নিয়ে আবার জাল মেরামত করে মাছ ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ অফিস সূত্রে জানা যায়, ১ থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত সাতক্ষীরা রেঞ্জের চারটি স্টেশন থেকে নৌকা নিবন্ধন বিএলসি (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) হয়েছে ২ হাজার ৯৭০টি। সুন্দরবন ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি খোদা বক্স গাজী জানান, 'পর্যটকের ওপর নির্ভর করে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় পাঁচ শতাধিক ট্রলার চলে।' তিনি আরও বলেন, 'জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাছ ও কাঁকড়া ধরা বন্ধ রাখার পাশাপাশি পর্যটক ঢোকা বন্ধ করে দেওয়া হয়।'
সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ফজলুল হক ব্যাখ্যা করেন, 'প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা, জীবজন্তু ও মাছের প্রজনন বাড়ানোর জন্য ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে নদ-নদীতে মাছ, কাঁকড়া ধরা এবং পর্যটক প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।' তিনি আরও জানান, 'আগামী ১ সেপ্টেম্বর সেই নিষেধাজ্ঞা উঠে যাচ্ছে। জেলে ও বাওয়ালিদের সুন্দরবনে ঢোকার পাস (অনুমতি) দেওয়া হবে।'
জেলেরা মনে করেন, সরকার সুন্দরবন ও মাছ-কাঁকড়া রক্ষায় যে অভিযান চালায় সেটি আরও কঠোর হওয়া উচিত। নেট জাল ও কারেন্ট জালের ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধসহ অবৈধভাবে সুন্দরবনে চোরা শিকারি বন্ধ করা দরকার। এতে করে সুন্দরবনের নদ-নদীতে মাছ-কাঁকড়া পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। এছাড়াও, সুন্দরবনের ডাকাতদের নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যদি পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তাহলে জেলেরা নিরাপদে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে পারবেন।
এভাবে, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জেলেরা আবার নদীতে নামার অনুমতি পাবেন এবং তাদের জীবিকা নির্বাহের সুযোগ ফিরে পাবেন।