পাসপোর্ট অফিসে আবেদন জমা নিয়ে ‘সময়ের ফাঁদ’: নেপথ্যে  ঘুষ বাণিজ্য..

মুহাম্মাদ রাকিব avatar   
মুহাম্মাদ রাকিব
স্টাফ রিপোর্টার :

পটুয়াখালী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস বর্তমানে দুর্নীতির নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে। সরকার নির্ধারিত অফিস সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা হলেও, এখানে আবেদনপত্র জমা নেওয়ার জন্য দুপুর ১টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম সংকট। আর এই ‘সময়ের ফাঁদ’ ব্যবহার করেই সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে কৌশলে অবৈধ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক এস. এম. এ সানির মৌন সম্মতি ও প্রশাসনিক কৌশলেই চলছে এই রমরমা দালালি।

ভৌগোলিক দূরত্বকে পুঁজি করে চাঁদাবাজি
পটুয়াখালী সদরসহ দুমকি, বাউফল, গলাচিপা, দশমিনা, মির্জাগঞ্জ, কলাপাড়া ও রাঙ্গাবালী—এই আটটি উপজেলার মানুষের একমাত্র ভরসা এই অফিসটি। বিশেষ করে দ্বীপ উপজেলা রাঙ্গাবালী এবং কলাপাড়ার লতাচাপলী, ধুলাসার ও ধানখালী ইউনিয়ন ,  দশমিনা উপজেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ চরবোরহান ইউনিয়নের মানুষকে কয়েক দফা নদী পাড়ি দিয়ে জেলা শহরে আসতে  কমপক্ষে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয়।  ভুক্তভোগীদের দাবি, দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে দুপুর ১টার মধ্যে আবেদন জমা দেওয়া প্রায়শই  অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতাকে পুঁজি করেই পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনৈতিক লেনদেনের জাল বিছিয়ে রেখেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, আবেদন জমা নেওয়ার কাউন্টারে দুপুর ১টা পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়ে বিজ্ঞপ্তি টাঙানো হয়েছে। ১টার পর আসা সেবাগ্রহীতাদের সরাসরি ‘সার্ভার সমস্যা’ বা ‘সময় শেষ’ বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সম্প্রতি জেলা প্রশাসন পাসপোর্ট অফিসের পাশের অবৈধ দোকানগুলো গুঁড়িয়ে দিলেও দালালি বন্ধ হয়নি। বর্তমানে চক্রটি পাশের এলজিইডি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয়ের ভেতরের অংশে চেয়ার-টেবিল ও কম্পিউটার নিয়ে  কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

কলাপাড়া,  রাঙ্গাবালী,  দশমিনার চরবোরহান থেকে আসা একাধিক ভুক্তভোগী জানান, "বাড়ি থেকে রওনা দিয়ে আসতে আসতেই দুপুর  হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে আগের দিন এসে হোটেলে থাকতে হয়। পরদিন সকালে লাইনে দাঁড়ালেও সিরিয়াল মেলে ৩৫-৪০ নম্বরের পরে, যা অফিসের কর্মকর্তাদের নিজস্ব লোক বা দালালের মাধ্যমে আসা। শেষ পর্যন্ত কাজ না হওয়ায় আমরা তাদের  টাকা দিতে বাধ্য হই। টাকা দিলে সব নিয়ম সহজ হয়ে যায়।"

আবেদন জমার সময়সীমার  বিষয়ে জানতে চাইলে পটুয়াখালী  আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক এস. এম. এ সানি এই নিয়মকে সমর্থন করে জানান, প্রতিদিন ৩০-৪০টি আবেদন জমা হয় এবং সেগুলো ওয়েবসাইটে আপলোড করতে অনেক সময় লাগে। তবে ৩০-৪০টি আবেদন জমা দিতে কেন আলাদাভাবে ৩ ঘন্টা  সময় কেন লাগবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অজুহাত দেখান।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ডিজিটাল বাংলাদেশের যুগে বিদ্যুৎ বা সার্ভারের দোহাই দিয়ে সেবা আটকে রাখা মূলত সেবাগ্রহীতাদের দুর্ভোগে ফেলে অনৈতিক অর্থ লেনদেনে বাধ্য করার একটি অপকৌশল মাত্র। এই দুর্নীতির আখড়া থেকে মুক্তি পেতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন পটুয়াখালীবাসী।

No comments found


News Card Generator