নির্ধারিত সময়ে খাল পুনঃখনন, সাশ্রয় হওয়া পৌনে ৪৮ লাখ টাকা!

Ratna Begum avatar   
Ratna Begum
নির্ধারিত সময়ে খাল পুনঃখনন, সাশ্রয় হওয়া পৌনে ৪৮ লাখ টাকা!
নির্ধারিত সময়ে খাল পুনঃখনন, সাশ্রয় হওয়া পৌনে ৪৮ লাখ টাকা!
ছবি: সংগৃহীত
খাল খনন পুনঃখনন কর্মসূচি ​মোট বরাদ্দকৃত পরিমাণ ৯৫ লাখ ৮৭ হাজার টাকার মধ্যে সাশ্রয়ী ৪৭ লাখ ৬৫ হাজার ৯৯৬ টাকা।..

নদীমাতৃক বাংলাদেশে খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়া কিংবা জলাবদ্ধতা নতুন কোনো খবর নয়। কিন্তু সেই খাল পুনঃখনন করে একদিকে যেমন কৃষকের মুখে হাসি ফোটানো হয়েছে, অন্যদিকে বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক টাকা বাঁচিয়ে সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলা প্রশাসন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলার গঙ্গাজলী ও মহিষাখালী—এই দুটি খালের মোট ৩.৭২০ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে মানসম্মত কাজ শেষ করার পর প্রাক্কলিত ব্যয়ের উদ্বৃত্ত ৪৭ লাখ ৬৫ হাজার ৯৯৬ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।

খাল দুটি পুনঃখননের ফলে স্থায়ীদের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার অবসান ঘটেছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশন হওয়ায় সময়মতো ফসল বুনতে পারছেন স্থানীয় কৃষকরা।

গঙ্গাজলী খাল সংলগ্ন এলাকার এক প্রবীণ নারী স্মৃতিচারণ করে বলেন,
"বিয়া হইছে ৪০ বছর। বউ হইয়া আইসা দেখছি এই খালে পানি চলত, মাছ ধরা যাইত। মাঝখানে ময়লা জমে রোড হইয়া গেছিল! অহন সরকার খনন করার পর পানি ভালো হইছে, গোসল ও ধোয়া-পালার সুবিধা হইছে।"

একই খালের পাড়ের এক কৃষক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে জানান,
"আগে মাঠে পানি আটকে থাকত, জমি লাগাইতে দুই মাস দেরি হইতো। অহন নদী থেইকা দ্রুত পানি নাইমা যায়। বৃষ্টি হইলেও আর ফসল নষ্ট হয় না, আমরা সময়মতো আঘোনি ধান লাগাইতে পারতেছি।"

অন্যদিকে মহিষাখালী খাল খননের প্রভাবে দুই ফসলি জমিতে রূপান্তর ও দেশীয় মাছের প্রাচুর্য নিয়ে কথা বলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান,
"আগে খাল ভরাট হয়া বর্ষার পানি জইমা থাকত। কিছুদিন আগে এত বড় বৃষ্টি হইল, অথচ চার-পাঁচ দিনে সব পানি নাইমা গেছে। আর হারিয়ে যাওয়া নদী-খালের মাছ আবার পাওয়া যাচ্ছে! ২৫-৩০ বছর পর আমিও এবার খালে নেমে মাছ ধরছি। এত মাছ, বলার বাইরে!"

আরেক নারী বাসিন্দা বলেন,
"আগে এক সিজন শুধু বোরো ধান পাইতাম। অহন জলাবদ্ধতা না থাকায় দুই সিজনে ফসল ফলাতে পারতেছি, আর খালের মাছ ধইরা খাইতে পারতেছি।"

প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট বরাদ্দ ছিল ৯৫ লাখ ৮৭ হাজার ৩৩ টাকা। বাজেট দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল—৫০% শ্রমিক নির্ভর (EGPP) এবং বাকি ৫০% এক্সক্যাভেটর দিয়ে কাজের জন্য।
বরাদ্দ বাঁচিয়ে টাকা ফেরত দেওয়ার নেপথ্য কারণ ব্যাখ্যা করে মনোহরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান,
"চলতি বছর অতিবৃষ্টির কারণে শ্রমিক দিয়ে কাজ করানোর উপযুক্ত পরিবেশ ছিল না। তাই শ্রমিক অংশের পরিবর্তে সরকারি বিধি মেনে এক্সক্যাভেটর ব্যবহার করা হয়। এক্সক্যাভেটরের মাধ্যমে তুলনামূলক কম সময়ে ও খরচে অনেক বেশি কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হওয়ায় বরাদ্দের একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যায়, যা আমরা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়েছি।"

গুণগত মানের বিষয়ে কোনো আপস করা হয়নি জানিয়ে ইউএনও আরও বলেন,
"প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (PIC) ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (PIO) মাধ্যমে আমরা নিয়মিত তদারকি করেছি। এটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারমূলক ফ্ল্যাগশিপ প্রোগ্রাম হওয়ায় কাজের মানে সর্বোচ্চ কঠোরতা বজায় রাখা হয়েছে। পাশাপাশি খালের পাড়ের মাটি ধরে রাখতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও সম্পন্ন করা হয়েছে।"

ইতিমধ্যেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে প্রকল্পের চূড়ান্ত সমাপ্তি প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগ কেবল এলাকার কৃষি, জলজ পরিবেশ ও সার্বিক অর্থনীতিতেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে না, বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসনের ক্ষেত্রে এটি দেশের অন্যান্য উপজেলার জন্য এক অনুকরণীয় মডেল হয়ে থাকবে।

Tidak ada komentar yang ditemukan


News Card Generator