৫জি rollout: ধীরগতির কারণ ও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

৫জি rollout: ধীরগতির কারণ ও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান

কামরুল হাসান  avatar   
কামরুল হাসান
৫জি rollout: ধীরগতির কারণ ও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান
৫জি rollout: ধীরগতির কারণ ও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) কর্তৃক ২০২২ সালে দেশে ৫জি স্পেকট্রাম নিলাম আয়োজন এবং টেলিটক ও গ্রামীণফোনের মতো অপারেটরদের সীমিত পরিসরে পরীক্ষাম...

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) কর্তৃক ২০২২ সালে দেশে ৫জি স্পেকট্রাম নিলাম আয়োজন এবং টেলিটক ও গ্রামীণফোনের মতো অপারেটরদের সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলক সেবা চালুর প্রায় দুই বছর অতিক্রান্ত হলেও, বাণিজ্যিকভাবে ৫জি প্রযুক্তি দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে এখনও অধরা। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, BTRC-এর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৫জি কাভারেজ এবং ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারেনি, যা প্রযুক্তিভিত্তিক উন্নয়নের পথে এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক টেলিযোগাযোগ বাজারের প্রেক্ষাপটে, যেখানে ভারত, ভিয়েতনাম এবং মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো ৫জি বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে, সেখানে বাংলাদেশের ধীরগতি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ডিজিটাল রূপান্তরে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

৫জি প্রযুক্তির ধীরগতির পেছনে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করা যায়। প্রথমত, উচ্চ স্পেকট্রাম মূল্য ও রোলআউট নীতি অপারেটরদের ওপর উল্লেখযোগ্য আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে। BTRC কর্তৃক নির্ধারিত স্পেকট্রামের উচ্চ বেঞ্চমার্ক মূল্য এবং প্রতিটি বেস ট্রান্সসিভার স্টেশন (BTS) স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল বিনিয়োগ, অপারেটরদের জন্য একটি টেকসই ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করা কঠিন করে তুলেছে। অপারেটররা এই বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে গ্রাহকদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক রিটার্নের অভাব দেখছেন, কারণ ৫জি উপযোগী হ্যান্ডসেটের প্রাপ্যতা এবং গ্রাহকদের মধ্যে এর চাহিদা এখনও সীমিত। উদাহরণস্বরূপ, টেলিকম অপারেটরদের পক্ষ থেকে বারবার স্পেকট্রামের দাম কমানোর আবেদন জানানো হলেও, BTRC সে বিষয়ে তেমন কোনো সাড়া দেয়নি। দ্বিতীয়ত, ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের অপর্যাপ্ততা এবং ব্যাকহোল অবকাঠামোর দুর্বলতা ৫জি বিস্তারের পথে একটি বড় বাধা। ৫জি প্রযুক্তির জন্য উচ্চ ব্যান্ডউইথ এবং কম ল্যাটেন্সি অপরিহার্য, যা কেবল শক্তিশালী ফাইবার অপটিক ব্যাকহোল দিয়েই সম্ভব। বাংলাদেশের গ্রামীণ এবং আধা-শহুরে অঞ্চলে ফাইবার অপটিকের বিস্তৃতি এখনও যথেষ্ট নয়, যা অপারেটরদের জন্য নতুন সাইট স্থাপন এবং বিদ্যমান সাইট আপগ্রেড করাকে ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ করে তুলছে। এছাড়াও, প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ অবকাঠামোর অভাব এবং টাওয়ার শেয়ারিং নীতির কার্যকারিতাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, যা ৫জি স্থাপনার খরচকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ নাজুক। যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত অতি দ্রুততার সাথে ৫জি রোলআউট সম্পন্ন করেছে এবং তাদের টেলিকম অপারেটররা ব্যাপক বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশব্যাপী কাভারেজ নিশ্চিত করেছে, সেখানে বাংলাদেশের ৫জি কার্যক্রম এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এমনকি ভিয়েতনাম এবং মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোও তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং সরকারি সহায়তার মাধ্যমে ৫জি ইকোসিস্টেম গঠনে এগিয়ে আছে। এই দেশগুলো কেবল অবকাঠামোতেই বিনিয়োগ করছে না, বরং ৫জি-ভিত্তিক উদ্ভাবনী সেবা এবং অ্যাপ্লিকেশন তৈরিতেও গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, ICT Division এবং a2i-এর ডিজিটাল বাংলাদেশ ফ্রেমওয়ার্ক থাকা সত্ত্বেও, ৫জি-এর জন্য প্রয়োজনীয় অ্যাপ্লিকেশন ও সেবার উন্নয়ন এখনও তেমন গতি পায়নি। BASIS-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সফটওয়্যার ও আইটি সেবা রপ্তানিতে জোর দিলেও, ৫জি-কে কেন্দ্র করে নতুন অ্যাপ্লিকেশন বা উল্লম্ব শিল্প (vertical industries) যেমন স্মার্ট ফ্যাক্টরি, স্মার্ট এগ্রিকালচার বা দূরবর্তী স্বাস্থ্যসেবার মতো ক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবন তুলনামূলকভাবে কম। BHTPA (বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ) হাই-টেক পার্কগুলোতে ৫জি-ভিত্তিক গবেষণা ও উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করলেও, এর বাস্তব প্রভাব এখনও সীমিত। এই ধীরগতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুবিধা গ্রহণে বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিতে পারে, যা দেশের অর্থনীতি এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

দেশ ৫জি বাণিজ্যিক রোলআউটের বছর ২০২৩ সালের মধ্যে ৫জি কাভারেজ (%) (শহুরে) ২০২৩ সালে প্রতি জিবি ডেটার গড় মূল্য (USD) টেলিকম খাতে ২০২৩ সালের FDI (মিলিয়ন USD)
বাংলাদেশ ২০২২ (সীমিত) ১৫-২০% ০.৭০ ২৫০-৩০০
ভারত ২০২২ (ব্যাপক) ৮০-৮৫% ০.১৭ ৪০০০-৫০০০
ভিয়েতনাম ২০২০ (সীমিত), ২০২৪ (ব্যাপক) ৪০-৪৫% ০.৫৮ ৫০০-৬০০
মালয়েশিয়া ২০২১ (ব্যাপক) ৬৫-৭০% ০.২৫ ১০০০-১২০০

উৎস: BTRC বার্ষিক প্রতিবেদন, GSMA Intelligence, Ookla, বিশ্বব্যাংক ডেটাবেজ ও সংশ্লিষ্ট দেশের টেলিকম রেগুলেটরি বডির তথ্য।

সুপারিশ

  • BTRC-কে 'টেলিকমিউনিকেশন সার্ভিসেস (কোয়ালিটি অফ সার্ভিস) রেগুলেশন, ২০২১' এর অধীনে ৫জি স্পেকট্রামের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে হ্রাস করতে হবে এবং অপারেটরদের জন্য সহজ কিস্তিতে পরিশোধের ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে বিনিয়োগের প্রাথমিক চাপ কমে এবং দ্রুত রোলআউট উৎসাহিত হয়।
  • ICT Division এবং a2i-কে 'জাতীয় ডিজিটাল আর্কিটেকচার (NDA)' ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে একটি সমন্বিত '৫জি অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট ফান্ড' গঠন করতে হবে এবং BASIS ও BHTPA-এর সাথে অংশীদারিত্বে স্মার্ট সিটি, স্মার্ট এগ্রিকালচার, ইন্ড্রাস্ট্রি ৪.০-এর মতো উল্লম্ব ক্ষেত্রগুলোতে ৫জি-ভিত্তিক উদ্ভাবনী সেবার গবেষণা ও উন্নয়নে অর্থায়ন করতে হবে।
  • BTRC-কে 'টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক শেয়ারিং রেগুলেশন, ২০১৮' এর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক ও টাওয়ার শেয়ারিং অবকাঠামোতে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে হবে, বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (PPP) মাধ্যমে 'ন্যাশনাল ফাইবার অপটিক ব্যাকবোন' প্রকল্পগুলো দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কামরুল হাসান

কামরুল হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: টেলিকম, ৫জি ও ইন্টারনেট অবকাঠামো। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator