শেয়ারবাজারের ফাঁকফোকর: স্বাধীন পরিচালকের ভূমিকায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ছায়া | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

শেয়ারবাজারের ফাঁকফোকর: স্বাধীন পরিচালকের ভূমিকায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ছায়া

অ্যাডভোকেট কায়সার  avatar   
অ্যাডভোকেট কায়সার
শেয়ারবাজারের ফাঁকফোকর: স্বাধীন পরিচালকের ভূমিকায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ছায়া
শেয়ারবাজারের ফাঁকফোকর: স্বাধীন পরিচালকের ভূমিকায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ছায়া
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) এক অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত প্রায় ৩০% কোম্পানিতে স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) এক অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত প্রায় ৩০% কোম্পানিতে স্বাধীন পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে করপোরেট গভর্ন্যান্স কোডের গুরুতর ব্যত্যয় ঘটেছে। এসব স্বাধীন পরিচালকের অনেকেই কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সঙ্গে সরাসরি পারিবারিক বা ব্যবসায়িক সম্পর্কযুক্ত, যা তাদের ‘স্বাধীন’ পরিচয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই পরিস্থিতি শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন করছে, বিশেষ করে যখন দেশের শেয়ারবাজার একটি দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, গত বছর একটি বৃহৎ পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন পরিচালক হিসেবে এমন একজন ব্যক্তি নিযুক্ত হন, যিনি ওই কোম্পানির কর্ণধারের ভগ্নিপতি। এই নিয়োগ বিএসইসির কঠোর নজরদারির পরেও করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড ২০১৬-এর ১(২)(ক) ধারা লঙ্ঘন করে, যা স্বাধীন পরিচালকের সংজ্ঞায় স্পষ্টতই উল্লেখ করে যে, তিনি কোম্পানির নির্বাহী বা অনির্বাহী পরিচালক বা কোম্পানির কোনো সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কযুক্ত হতে পারবেন না।

এই ধরনের নিয়োগ শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়, বরং এটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির একটি সূক্ষ্ম অথচ শক্তিশালী প্রকাশ। স্বাধীন পরিচালকদের মূল ভূমিকা হলো কোম্পানির ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, স্বার্থের সংঘাত এড়ানো এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অধিকার রক্ষা করা। কিন্তু যখন স্বাধীন পরিচালকদের নিয়োগ প্রক্রিয়াই ত্রুটিপূর্ণ হয় এবং তারা কোম্পানির মূল মালিকানা বা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত হন, তখন তাদের পক্ষে নিরপেক্ষভাবে কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর ফলে, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব দেখা দেয়, অভ্যন্তরীণ লেনদেনে কারচুপি বা অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং শেষ পর্যন্ত কোম্পানির সামগ্রিক আর্থিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) উভয়ই তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের করপোরেট গভর্ন্যান্স ফ্রেমওয়ার্কের দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, বিশেষ করে স্বাধীন পরিচালকদের কার্যকারিতা এবং তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাবকে তারা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাদের মতে, এই দুর্বলতা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাধা সৃষ্টি করছে এবং স্থানীয় বাজারের স্থিতিশীলতা ব্যাহত করছে।

এই সমস্যাটির মূল কারণ নিহিত আছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলির দুর্বল প্রয়োগ এবং বিদ্যমান আইনের ফাঁকফোকরে। বিএসইসি করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড প্রণয়ন করলেও, এর বাস্তবায়ন এবং লঙ্ঘনের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে প্রায়শই শিথিলতা দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্বাধীন পরিচালকদের পদাধিকারবলে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা এবং লভ্যাংশ প্রদানের ক্ষেত্রেও অনিয়ম ঘটে, যা তাদের নিরপেক্ষতা আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে। বাংলাদেশ সরকার শেয়ারবাজারের উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও, এই মৌলিক সুশাসনের ঘাটতি বাজারের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৭ সালে একটি বিতর্কিত কোম্পানি তাদের স্বাধীন পরিচালক হিসেবে এমন একজন আইনজীবীকে নিয়োগ দিয়েছিল, যিনি কোম্পানির বিরুদ্ধে চলমান একটি মামলার পরামর্শক ছিলেন। এই ঘটনা সরাসরি করপোরেট গভর্ন্যান্স কোডের স্পষ্ট লঙ্ঘন ছিল এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে তদন্ত শুরু করলেও, শেষ পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি, যা এমন অনিয়মকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করে। এই ধরনের দৃষ্টান্তগুলো প্রমাণ করে যে, কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, বরং তার কঠোর প্রয়োগ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।

সাল বিএসইসি কর্তৃক চিহ্নিত অনিয়মিত স্বাধীন পরিচালকের অনুপাত (%) ওয়ার্ল্ড ব্যাংক কর্তৃক চিহ্নিত কর্পোরেট সুশাসন স্কোর (১-৫ স্কেলে) এডিবি কর্তৃক বিনিয়োগ ঝুঁকি সূচক (১-১০ স্কেলে, ১০ = সর্বোচ্চ ঝুঁকি)
২০১৯ ২২% ২.৯ ৬.৫
২০২০ ২৫% ২.৭ ৭.০
২০২১ ২৮% ২.৫ ৭.৫
২০২২ ৩০% ২.৪ ৭.৮
২০২৩ ৩২% ২.৩ ৮.০

উৎস: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) 'Doing Business Report' এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) 'Asian Development Outlook' প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড ২০১৬-এর স্বাধীন পরিচালক সংক্রান্ত ধারাগুলির কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানাসহ আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই লক্ষ্যে, বিএসইসি'র এনফোর্সমেন্ট বিভাগকে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন করতে হবে।
  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে অর্থ মন্ত্রণালয়কে, স্বাধীন পরিচালকদের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করতে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেস তৈরি করার উদ্যোগ নিতে হবে, যেখানে সম্ভাব্য স্বাধীন পরিচালকদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং কোনো কোম্পানির সঙ্গে তাদের সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতের তথ্য তালিকাভুক্ত থাকবে। এটি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।
  • বাংলাদেশ সরকার, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB)-এর সহায়তায়, করপোরেট গভর্ন্যান্স কাঠামো শক্তিশালীকরণের জন্য একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করতে পারে, যার কাজ হবে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম অনুশীলনগুলির আলোকে বিদ্যমান আইন ও নীতিগুলির সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করা এবং স্বাধীন পরিচালকদের প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট কায়সার

অ্যাডভোকেট কায়সার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: করপোরেট গভর্ন্যান্স ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Комментариев нет


News Card Generator