লুকানো ক্ষত: ডিজিটাল কপিরাইট আইন প্রয়োগে ব্যর্থতা ও সৃজনশীল শিল্পের ভবিষ্যৎ

ব্যারিস্টার নাদিয়া  avatar   
ব্যারিস্টার নাদিয়া
লুকানো ক্ষত: ডিজিটাল কপিরাইট আইন প্রয়োগে ব্যর্থতা ও সৃজনশীল শিল্পের ভবিষ্যৎ
লুকানো ক্ষত: ডিজিটাল কপিরাইট আইন প্রয়োগে ব্যর্থতা ও সৃজনশীল শিল্পের ভবিষ্যৎ
ছবি: সংগৃহীত

গত মার্চ মাসে দেশের শীর্ষস্থানীয় ইউটিউব চ্যানেল 'গানচিল'-এর প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের ডিজিটাল কনটেন্ট অননুমোদিতভাবে কপিরাইট লঙ্ঘন করে আপলোড করার ঘটনা এবং এ...

গত মার্চ মাসে দেশের শীর্ষস্থানীয় ইউটিউব চ্যানেল 'গানচিল'-এর প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের ডিজিটাল কনটেন্ট অননুমোদিতভাবে কপিরাইট লঙ্ঘন করে আপলোড করার ঘটনা এবং এর পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপের ধীর গতি আবারও ডিজিটাল কপিরাইট আইন প্রয়োগের দুর্বলতা প্রকটভাবে উন্মোচন করেছে। এই একক ঘটনা, যা দেশের সৃজনশীল ডিজিটাল অর্থনীতির একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র, তা স্পষ্ট করে যে কীভাবে মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অপর্যাপ্ততা হাজার হাজার সৃজনশীল উদ্যোক্তা ও শিল্পীর ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। যদিও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর অধীনে সাইবার অপরাধ দমনের বিধান রয়েছে, কিন্তু কপিরাইট লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এর প্রয়োগ কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

সৃজনশীল শিল্প, বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম সম্ভাব্য চালিকাশক্তি হতে পারতো। কিন্তু কপিরাইট লঙ্ঘনের ব্যাপকতা এবং এর বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকারের দীর্ঘসূত্রিতা এই সম্ভাবনাকে শুরুতেই গলা টিপে ধরছে। বিশ্বব্যাংকের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে (২০২২) উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) সৃজনশীল শিল্পের অবদান ১.৫% এর কম, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের গড় (৩-৫%) এর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এই অনুপাত কম থাকার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় দুর্বল কাঠামো এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অননুমোদিত কনটেন্টের অবাধ প্রবাহ। এর ফলস্বরূপ, দেশীয় সৃজনশীল প্রতিভারা যেমন তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনি নতুন বিনিয়োগকারীরাও এই খাতে অর্থলগ্নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছেন, যা উদ্ভাবন ও প্রসারের পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে।

ডিজিটাল কপিরাইট লঙ্ঘনের এই প্রবণতা কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই করছে না, বরং একটি জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সৃজনশীলতার মূল ভিত্তিকেও ক্ষয় করছে। অদক্ষ প্রয়োগ এবং অসচেতনতা সম্মিলিতভাবে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে চোরেরা সহজেই পার পেয়ে যায়, আর প্রকৃত সৃজনশীলরা হতাশ হয়ে শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত কপিরাইট আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৫ ও ২০২২) এবং এর অধীনে গঠিত কপিরাইট অফিস থাকলেও, ডিজিটাল মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া হাজার হাজার লঙ্ঘনের ঘটনা তদারকি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে তাদের সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এর 'ডিজিটাল ইকোনমি ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ' শীর্ষক এক গবেষণাপত্রে (২০২৩) বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে মেধাস্বত্ব সুরক্ষা একটি অন্যতম দুর্বল দিক, যা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং স্থানীয় ডিজিটাল পণ্য ও সেবার রপ্তানি সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করছে। কপিরাইট অফিস ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং ডিজিটাল ফরেনসিক দক্ষতা ও পর্যাপ্ত জনবলের অভাব এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২
ডিজিটাল কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগ (কপিরাইট অফিসে নিবন্ধিত) ৩৫০ ৫২০ ৬০০
অভিযোগের ভিত্তিতে সফল আইনি পদক্ষেপ (%) ১২% ১০% ৮%
সৃজনশীল শিল্পে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (মিলিয়ন USD) ৫০ ৪৫ ৪০
ডিজিটাল কনটেন্ট থেকে আয় হার (প্রতি শিল্পী/প্রতিষ্ঠান, আনুমানিক) ২০% ১৮% ১৫%

উৎস: বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস, বাংলাদেশ ব্যাংক, World Bank (আনুমানিক গবেষণা)

সুপারিশ

  • কপিরাইট আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২২) এর অধীনে ডিজিটাল কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য সুনির্দিষ্ট ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে বিচার বিভাগ এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা আদালত গঠন করা।
  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের মধ্যে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যা AI-ভিত্তিক টুলস ব্যবহার করে ডিজিটাল কনটেন্ট স্ক্যান করবে এবং লঙ্ঘনের ঘটনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে অবহিত করবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং তথ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মেধাস্বত্ব আইন এবং এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করবে এবং নিয়মিত কর্মশালা আয়োজন করবে, যাতে ভবিষ্যতে কপিরাইট লঙ্ঘনের প্রবণতা কমে আসে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ব্যারিস্টার নাদিয়া

ব্যারিস্টার নাদিয়া 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No se encontraron comentarios


News Card Generator