মেডিকেল রিসার্চ ও বায়োটেকনোলজি: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মেডিকেল রিসার্চ ও বায়োটেকনোলজি: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

ড. সাবরিনা ইয়াসমিন  avatar   
ড. সাবরিনা ইয়াসমিন
মেডিকেল রিসার্চ ও বায়োটেকনোলজি: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
মেডিকেল রিসার্চ ও বায়োটেকনোলজি: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট জিডিপির মাত্র ০.০২% চিকিৎসা গবেষণা ও বায়োটেকনোলজি খাতে ব্যয় হয়, যা দক্ষিণ ...

সম্প্রতি, বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট জিডিপির মাত্র ০.০২% চিকিৎসা গবেষণা ও বায়োটেকনোলজি খাতে ব্যয় হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড় (০.০৫%) এবং বৈশ্বিক গড় (১.৫%-২.০%) থেকে অনেক নিচে। এই পরিসংখ্যান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল (BMRC) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগের অপ্রতুলতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় যখন দেশীয় টিকা ও পরীক্ষা পদ্ধতি উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তা প্রকটভাবে অনুভূত হয়েছিল, তখনও এই খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। এটি কেবল আর্থিক বিনিয়োগের অভাব নয়, বরং সুদূরপ্রসারী নীতি এবং বাস্তবায়ন কৌশলের দুর্বলতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

বাংলাদেশের চিকিৎসা গবেষণা ও বায়োটেকনোলজি খাতের এই স্থবিরতা কেবল অর্থের অভাবে নয়, বরং একটি সমন্বিত ও দূরদর্শী নীতির অনুপস্থিতি এবং প্রায়োগিক সিস্টেমের জটিলতার ফল। গবেষণা অনুদান প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং গবেষণার ফলাফলকে পেটেন্ট বা বাণিজ্যিকীকরণ করার ক্ষেত্রে আইনি ও পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা এই খাতকে পিছিয়ে রেখেছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০১৩ সালে প্রণীত জাতীয় বায়োসেফটি গাইডলাইন এবং পরবর্তীতে ২০১৯ সালে সংশোধিত জাতীয় বায়োটেকনোলজি নীতি থাকা সত্ত্বেও, এর বাস্তবায়ন ও তদারকি দুর্বল। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেলের মাধ্যমে গবেষণাকে উৎসাহিত করার কথা বলা হলেও, বাস্তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় প্রকল্প আলোর মুখ দেখছে না। এছাড়া, দক্ষ গবেষক এবং আধুনিক ল্যাবরেটরির অপ্রতুলতাও একটি বড় সমস্যা। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বায়োটেকনোলজি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা দেওয়া হলেও, শিল্প ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে তাদের সংযোগ দুর্বল, যার ফলে অ্যাকাডেমিক গবেষণা প্রায়শই বাস্তব জীবনের চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বারংবার সদস্য দেশগুলোকে স্বাস্থ্য গবেষণায় জিডিপির অন্তত ১% ব্যয় করার সুপারিশ করলেও, বাংলাদেশ সেই লক্ষ্যমাত্রা থেকে বহু দূরে। এই ব্যবধান পূরণ করতে না পারলে ভবিষ্যতের মহামারী মোকাবেলা এবং নতুন রোগের চিকিৎসায় দেশীয় সক্ষমতা তৈরি করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

এই খাতের দুর্বলতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অভাব এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরে ধীরগতি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে স্বাস্থ্য খাতে ঋণ ও অনুদান এলেও, সেগুলোর সিংহভাগই অবকাঠামো নির্মাণ বা ঔষধ আমদানিতে ব্যয় হয়, মৌলিক গবেষণা বা বায়োটেকনোলজি উদ্ভাবনে নয়। এর ফলে দেশীয় গবেষকরা বিশ্বমানের গবেষণার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, স্টেম সেল গবেষণা এবং নতুন প্রজন্মের ডায়াগনস্টিক কিট উদ্ভাবনে যে ধরনের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন, তার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও নীতি সহায়তা অপ্রতুল। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) নতুন ঔষধ বা চিকিৎসা প্রযুক্তির অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও গতি আনতে পারলেও, গবেষণার প্রাথমিক ধাপ থেকে শুরু করে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্যন্ত একটি সুসংগঠিত কাঠামো অনুপস্থিত। এমনকি, গবেষণার নৈতিক অনুমোদন (ethical clearance) প্রক্রিয়াও সময়সাপেক্ষ এবং প্রায়শই গবেষকদের নিরুৎসাহিত করে। ফলস্বরূপ, মেধাবী গবেষকরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন, যা দেশের 'ব্রেইন ড্রেন' সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলছে। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, নীতি প্রণেতাদের সদিচ্ছা হয়তো আছে, কিন্তু এর বাস্তবায়নে কার্যকর কৌশল এবং একটি শক্তিশালী সিস্টেম তৈরিতে তারা ব্যর্থ।

খাত গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে ব্যয় (জিডিপির শতাংশ) উৎস
বাংলাদেশ (চিকিৎসা ও বায়োটেকনোলজি) ০.০২% বিশ্বব্যাংক, ২০২০
দক্ষিণ এশিয়ার গড় (চিকিৎসা ও বায়োটেকনোলজি) ০.০৫% বিশ্বব্যাংক, ২০২০
বৈশ্বিক গড় (চিকিৎসা ও বায়োটেকনোলজি) ১.৫% - ২.০% WHO, OECD, ২০২০
বাংলাদেশ (সামগ্রিক R&D) ০.৩% বাংলাদেশ সরকার, জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বাজেট, ২০২১-২২

উৎস: বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (OECD), বাংলাদেশ সরকার (জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বাজেট)।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে একটি 'জাতীয় চিকিৎসা গবেষণা ও বায়োটেকনোলজি তহবিল' গঠন করা হোক, যেখানে World Bank এবং ADB-এর সহায়তায় জিডিপির কমপক্ষে ০.১% বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে। এই তহবিল থেকে প্রতিযোগিতামূলক অনুদান প্রদান এবং গবেষণার বাণিজ্যিকীকরণের জন্য 'বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (BCSIR)' ও 'জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্র (NARI)' এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হোক।
  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত 'জাতীয় বায়োটেকনোলজি নীতি-২০১৯' এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করা হোক, যার নেতৃত্বে থাকবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং সদস্য হিসেবে থাকবে 'বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল (BMRC)' ও 'ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA)'। এই টাস্কফোর্স নিয়মিতভাবে নীতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে এবং গবেষণার নৈতিক অনুমোদন প্রক্রিয়াকে এক মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য নতুন গাইডলাইন তৈরি করবে।
  • পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) এর মাধ্যমে বায়োটেকনোলজি পার্কে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে নতুন আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হোক এবং দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বায়োটেকনোলজি বিভাগের সঙ্গে শিল্প প্রতিষ্ঠানের যৌথ গবেষণার জন্য 'বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ' এর অধীনে একটি বিশেষ 'ইনোভেশন হাব' প্রতিষ্ঠা করা হোক, যা দেশীয় মেধাস্বত্ব (IP) সুরক্ষায় 'পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর' এর সঙ্গে সমন্বয় করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. সাবরিনা ইয়াসমিন

ড. সাবরিনা ইয়াসমিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মেডিকেল রিসার্চ ও বায়োটেকনোলজি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nessun commento trovato


News Card Generator