চিপ ডিজাইনে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ: স্বপ্ন না বাস্তবতার হাতছানি? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

চিপ ডিজাইনে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ: স্বপ্ন না বাস্তবতার হাতছানি?

রাইয়ান হোসেন  avatar   
রাইয়ান হোসেন
চিপ ডিজাইনে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ: স্বপ্ন না বাস্তবতার হাতছানি?
চিপ ডিজাইনে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ: স্বপ্ন না বাস্তবতার হাতছানি?
ছবি: সংগৃহীত

গত বছর বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের (BHTPA) তত্ত্বাবধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাই-টেক পার্কে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ও টেস্টিং ল্যাব স্থাপনের ঘোষণাটি বাংলা...

গত বছর বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের (BHTPA) তত্ত্বাবধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাই-টেক পার্কে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ও টেস্টিং ল্যাব স্থাপনের ঘোষণাটি বাংলাদেশের প্রযুক্তি শিল্পে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এই উদ্যোগটি কেবল একটি পরীক্ষাগার স্থাপন নয়, বরং চিপ ডিজাইন শিল্পে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণের একটি দৃঢ় ইঙ্গিত। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সেমিকন্ডাক্টর চিপের চাহিদা যেমন বাড়ছে, তেমনি এর সরবরাহ শৃঙ্খলে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও পরিলক্ষিত হচ্ছে। এমন একটি প্রেক্ষাপটে, স্থানীয়ভাবে চিপ ডিজাইন সক্ষমতা গড়ে তোলার এই প্রচেষ্টা দেশের প্রযুক্তিগত স্বায়ত্তশাসন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এই পদক্ষেপ কি কেবল একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্বপ্ন, নাকি বাস্তবতার কষ্টিপাথরে যাচাইযোগ্য একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের হাতছানি? এই প্রশ্নটিই এখন দেশের প্রযুক্তিবিদ, নীতিনির্ধারক এবং বিনিয়োগকারীদের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রামের যৌথ উদ্যোগে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন এবং এমবেডেড সিস্টেমের উপর দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচী চালু করা হয়েছে, যা এই খাতের জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং (EEE) এবং কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং (CSE) গ্র্যাজুয়েটদের একটি বিশাল পুল রয়েছে, যারা উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পেলে এই জটিল শিল্পে অবদান রাখতে সক্ষম। তবে, এই প্রশিক্ষিত জনবলকে বাস্তবে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং বিনিয়োগ। আন্তর্জাতিক মানের ডিজাইন টুলস, সফটওয়্যার লাইসেন্স এবং টেস্টিং ইকুইপমেন্ট অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এগুলোর সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উপরন্তু, স্থানীয় স্টার্টআপ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পর্যাপ্ত তহবিল এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের সুযোগ সৃষ্টি করা না গেলে এই সম্ভাবনা কেবল প্রাথমিক পর্যায়েই সীমিত থাকবে।

সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন শিল্পে সফলতার জন্য শুধু দক্ষ জনবল বা ল্যাব থাকলেই চলে না, বরং একটি সহায়ক ইকোসিস্টেমও অপরিহার্য। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এর সদস্যভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠান বিদেশি ক্লায়েন্টদের জন্য সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এবং আইটি পরিষেবা প্রদান করছে, যা তাদের আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছে। এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে চিপ ডিজাইন সেবায় রূপান্তর করা যেতে পারে। বিশেষ করে, ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT) ডিভাইস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) অ্যাপ্লিকেশন এবং ফাইভজি (5G) প্রযুক্তির জন্য কাস্টম চিপের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। এই ক্ষেত্রগুলোতে বাংলাদেশ তার সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারলে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করতে পারবে। তবে, এর জন্য বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC) এর মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনের জন্য সহায়ক নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে স্থানীয়ভাবে ডিজাইন করা চিপের ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হবে এবং এর মান নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো তৈরি করা হবে। বৈশ্বিক চিপ উৎপাদনকারী দেশগুলো যেমন তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্ব স্থাপন করা গেলে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বাজার প্রবেশের পথ সুগম হতে পারে, যা এই শিল্পকে দ্রুত বিকাশে সহায়তা করবে।

সূচক ২০২০ ২০২৩ লক্ষ্য ২০২৫ (আনুমানিক)
সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ারের সংখ্যা (আনুমানিক) ২৫০ ৫০০ ১০০০+
স্থানীয় চিপ ডিজাইন স্টার্টআপের সংখ্যা ১২ ২৫+
সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ও টেস্টিং ল্যাবের সংখ্যা ১ (প্রাথমিক) ৫+
ICT খাতে রপ্তানি আয় (বিলিয়ন USD) ১.১ ১.৪ ২.৫
হাই-টেক পার্কের সংখ্যা (কার্যক্রমরত) ১৩ ২০

উৎস: বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA), ICT বিভাগ, BASIS ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) এর যৌথ উদ্যোগে একটি 'সেমিকন্ডাক্টর ইনোভেশন ফান্ড' প্রতিষ্ঠা করা হোক, যা স্থানীয় চিপ ডিজাইন স্টার্টআপ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাথমিক মূলধন, আন্তর্জাতিক মানের ডিজাইন টুলস লাইসেন্স ক্রয় এবং প্রোটোটাইপিংয়ের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে। এই ফান্ড পরিচালনার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করতে হবে, যেখানে শিল্প ও একাডেমিয়ার প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
  • BASIS এর সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এবং অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রামের মাধ্যমে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন এবং ভেরিফিকেশনের উপর বিশেষায়িত স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম এবং সার্টিফিকেট কোর্স চালু করা হোক, যেখানে শিল্প বিশেষজ্ঞদের দ্বারা মেন্টরিং এবং আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম অনুসরণ করা হবে।
  • বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC) একটি 'স্থানীয় চিপ ব্যবহার নীতি' প্রণয়ন করুক, যেখানে সরকারি ক্রয় এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে স্থানীয়ভাবে ডিজাইন করা চিপের ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং এর গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য একটি সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া চালু করা হবে, যা স্থানীয় উদ্ভাবকদের উৎসাহিত করবে এবং তাদের পণ্যের বাজার তৈরি করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রাইয়ান হোসেন

রাইয়ান হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স ইন্ডাস্ট্রি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator