ভারত মহাসাগরে চীনের ছায়া: ঢাকার কৌশলগত চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ভারত মহাসাগরে চীনের ছায়া: ঢাকার কৌশলগত চ্যালেঞ্জ

শাহেদ করিম  avatar   
শাহেদ করিম
ভারত মহাসাগরে চীনের ছায়া: ঢাকার কৌশলগত চ্যালেঞ্জ
ভারত মহাসাগরে চীনের ছায়া: ঢাকার কৌশলগত চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত

গত বছর শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরে চীনের ইউয়ান ওয়াং ৫ নামের একটি 'গবেষণা জাহাজ'-এর আগমন, যা পশ্চিমে 'ডুয়াল-ইউজ' গুপ্তচরবৃত্তির জাহাজ হিসেবে পরিচিত, তা ভ...

ভারত মহাসাগরে চীনের ছায়া: ঢাকার কৌশলগত চ্যালেঞ্জ

গত বছর শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরে চীনের ইউয়ান ওয়াং ৫ নামের একটি 'গবেষণা জাহাজ'-এর আগমন, যা পশ্চিমে 'ডুয়াল-ইউজ' গুপ্তচরবৃত্তির জাহাজ হিসেবে পরিচিত, তা ভারত মহাসাগরের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনেছে। এর আগেও, ২০১৩ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে চীনের সাবমেরিনের আগমন নিয়ে দিল্লির উদ্বেগ ছিল স্পষ্ট। এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং বেইজিংয়ের 'স্ট্রিং অব পার্লস' কৌশল এবং 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI)-এর অধীনে ভারত মহাসাগরীয় দেশগুলোতে ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি ধারাবাহিক চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশের জন্য, যা এই অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এই পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তার পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গভীর কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ঢাকা একদিকে তার দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য চীনের বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা অপরিহার্য মনে করে, অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী অংশীদার ভারত এবং পশ্চিমা বিশ্বের সাথে তার ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চাপ অনুভব করে। এই জটিল সমীকরণে, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান নৌ সক্ষমতা আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা ঢাকাকে একটি সতর্ক ও দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বনে বাধ্য করছে।

চীনের এই কৌশলগত উপস্থিতি শুধুমাত্র সামরিক দিক থেকেই নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও প্রসারিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে চীনের বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI) উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার একটি বড় অংশ অবকাঠামো উন্নয়নে নিয়োজিত। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী টানেল এবং মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো মেগা প্রকল্পগুলোতে চীনের বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে। এই বিনিয়োগগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, এর সাথে যুক্ত রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি। ঋণ-ফাঁদ কূটনীতি (Debt-trap diplomacy) নিয়ে পশ্চিমা ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রায়শই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়, যেখানে চীন দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোকে বড় অঙ্কের ঋণ দিয়ে তাদের অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ করে এবং পরবর্তীতে ঋণের বোঝা পরিশোধে ব্যর্থ হলে কৌশলগত সম্পদগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের ৯৯ বছরের লিজ এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। যদিও বাংলাদেশ সরকার চীনের সাথে তার সম্পর্ককে 'উইন-উইন' পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করে, তবে এই ধরনের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং বিকল্প অর্থায়নের উৎস অন্বেষণ করা অপরিহার্য। পাশাপাশি, বঙ্গোপসাগরে চীনের নৌবাহিনীর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি, বিশেষ করে ভারত মহাসাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। চীনের সাবমেরিন ও যুদ্ধজাহাজের আনাগোনা, যা বঙ্গোপসাগরের জলসীমায় কখনও কখনও দেখা যায়, তা ভারতের জন্য একটি প্রত্যক্ষ নিরাপত্তা হুমকি এবং বাংলাদেশের জন্য তার নিজস্ব জলসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও বহুপাক্ষিক নৌ কূটনীতিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নতুন কৌশলগত প্রশ্ন তৈরি করে।

এই জটিল পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি বহুমুখী কূটনীতি পরিচালনা করতে হচ্ছে। একদিকে, বাংলাদেশ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে (UN Peacekeeping) অন্যতম প্রধান সেনা ও পুলিশ সরবরাহকারী দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে। অন্যদিকে, আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা যেমন BIMSTEC (Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation) এবং সার্ক (South Asian Association for Regional Cooperation)-এর মাধ্যমে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সংহতি বজায় রাখার চেষ্টা করে। তবে, সার্কের কার্যকারিতা বর্তমানে স্থবির, এবং BIMSTEC এখনও তার পূর্ণ সম্ভাবনা উপলব্ধি করতে পারেনি, যার ফলে আঞ্চলিক দেশগুলো পৃথকভাবে চীনের প্রভাব মোকাবিলা করতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশ তার 'কারো প্রতি বিদ্বেষ নয়, সবার সাথে বন্ধুত্ব' নীতি অনুসরণ করে চললেও, ভারত মহাসাগরে চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা ঢাকার জন্য একটি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করেছে। মিয়ানমারের সাথে রোহিঙ্গা সংকট এবং বঙ্গোপসাগরের গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে চলমান আঞ্চলিক বিতর্কগুলো এই ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আরও জটিলতা যোগ করেছে। চীনের সাথে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, যেমন সাবমেরিন ক্রয় এবং নৌবাহিনীর আধুনিকীকরণ, ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে বাড়িয়ে তুলেছে, যা বাংলাদেশের জন্য ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জকে আরও কঠিন করে তুলেছে। তাই, একটি শক্তিশালী জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে নিবিড় সমন্বয় ছাড়া এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন হবে।

দেশের নাম ২০১০ সালে চীনের বিনিয়োগ (বিলিয়ন USD) ২০২০ সালে চীনের বিনিয়োগ (বিলিয়ন USD) ২০১০-২০২০ বৃদ্ধির হার (%) প্রধান বিনিয়োগ খাত
বাংলাদেশ ০.৩ ৬.৫ ২১৬৬.৬৭ অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ
পাকিস্তান ১.২ ২০.৪ ১৬০০.০০ CPEC, জ্বালানি, পরিবহন
শ্রীলঙ্কা ০.২ ৩.৮ ১৮০০.০০ বন্দর, সড়ক, বিদ্যুৎ
মালদ্বীপ ০.০৫ ১.২ ২৩০০.০০ পর্যটন, অবকাঠামো
নেপাল ০.১ ১.৫ ১৪০০.০০ অবকাঠামো, জলবিদ্যুৎ

উৎস: বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত উপাত্তের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ।

সুপারিশ

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি 'ভারত মহাসাগর কৌশল' প্রণয়ন করতে হবে, যা চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপের রূপরেখা দেবে। এই কৌশলটি আঞ্চলিক অংশীদার, বিশেষত BIMSTEC সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সাথে গভীর সহযোগিতা এবং UN Peacekeeping ম্যান্ডেটের অধীনে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাংলাদেশের সক্রিয় ভূমিকা জোরদার করবে।
  • বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে একটি 'বৈচিত্র্যপূর্ণ অর্থায়ন নীতি' গ্রহণ করতে হবে, যেখানে অবকাঠামো প্রকল্পে শুধুমাত্র চীনের উপর নির্ভরতা কমিয়ে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর মতো বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলো থেকে ঋণ ও বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে ঋণ-ফাঁদের ঝুঁকি হ্রাস পাবে এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত থাকবে।
  • জাতীয় সংসদকে 'জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল আইন' পাশ করে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল (NSC) গঠন করতে হবে, যা ভারত মহাসাগরের ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো পর্যবেক্ষণ করবে এবং সামরিক, গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করে দেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারকে সহায়তা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শাহেদ করিম

শাহেদ করিম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator