বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম: 'ফলো-অন ফান্ডিং' সংকট ও বিদেশি বিনিয়োগের হাতছানি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম: 'ফলো-অন ফান্ডিং' সংকট ও বিদেশি বিনিয়োগের হাতছানি

শাহরিয়ার নাফিস  avatar   
শাহরিয়ার নাফিস
বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম: 'ফলো-অন ফান্ডিং' সংকট ও বিদেশি বিনিয়োগের হাতছানি
বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম: 'ফলো-অন ফান্ডিং' সংকট ও বিদেশি বিনিয়োগের হাতছানি
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক স্টার্টআপগুলোর জন্য অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) চালুর উদ্যোগ এবং এর প্রাথমিক ফলপ...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক স্টার্টআপগুলোর জন্য অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) চালুর উদ্যোগ এবং এর প্রাথমিক ফলপ্রসূতা নিয়ে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ভিসি) প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা বাংলাদেশের উদীয়মান স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের গভীর চ্যালেঞ্জগুলো পুনরায় সামনে এনেছে। বিশেষত, সিড বা অ্যাঞ্জেল বিনিয়োগের পর 'ফলো-অন ফান্ডিং' বা পরবর্তী ধাপের বিনিয়োগ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে স্টার্টআপগুলো যে তীব্র সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, এটিবি তার একটি সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে বিবেচিত হলেও, এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতের অপার সম্ভাবনা থাকলেও, স্থানীয় নীতি ও কাঠামোগত দুর্বলতা প্রায়শই তাদের নিরুৎসাহিত করছে, যা দেশের অর্থনীতিতে নতুন উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে প্রাথমিক বিনিয়োগ, যা সাধারণত সিড বা অ্যাঞ্জেল ফান্ডিং হিসেবে পরিচিত, তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য হলেও, সিরিজ এ, বি বা পরবর্তী ধাপের 'ফলো-অন ফান্ডিং' প্রাপ্তি একটি বিশাল প্রতিবন্ধকতা। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (VCAB)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন বছরে প্রায় ৭০% স্টার্টআপ প্রাথমিক বিনিয়োগ পাওয়ার পর পরবর্তী ধাপে অর্থ সংগ্রহে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে তাদের প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে গেছে অথবা অনেকে বন্ধ হয়ে গেছে। এই সংকটের মূল কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের (যেমন – ব্যাংক, বীমা কোম্পানি) ভেঞ্চার ক্যাপিটালে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনীহা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে স্পষ্ট নির্দেশনার অভাব। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ ব্যাংক বা বিএসইসি কর্তৃক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডে বিনিয়োগের জন্য ব্যাংক বা নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা বা ঝুঁকি কমানোর কোনো কার্যকর নীতি এখনো পর্যন্ত অনুপস্থিত। অন্যদিকে, ন্যাশনাল বোর্ড অফ রেভিনিউ (এনবিআর) কর্তৃক স্টার্টআপগুলোর জন্য করনীতিতে কিছু ছাড়ের ঘোষণা এলেও, তা ফলো-অন ফান্ডিং-এর সময় বিনিয়োগকারীদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা বা আকর্ষণীয়তা প্রদান করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা প্রায়শই এই নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগ থেকে বেরিয়ে আসার (এক্সিট) সুস্পষ্ট পথের অভাবে দ্বিধান্বিত থাকেন, যা দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের জন্য একটি বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাময় খাতটিকে পূর্ণ গতিতে এগিয়ে যেতে দিচ্ছে না।

বিদেশি বিনিয়োগের হাতছানি বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের জন্য একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনা হলেও, তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে দেশে আগত মোট বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (এফডিআই) মাত্র ১.৫% স্টার্টআপ খাতে এসেছে, যা প্রতিবেশী দেশ ভারত বা ইন্দোনেশিয়ার তুলনায় অনেক কম। এই সীমিত বিনিয়োগের কারণ হিসেবে সিপিডি একাধিক বিষয় চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো স্থানীয় ভিসি ফান্ডগুলোর সীমিত আকার এবং তাদের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের দুর্বলতা। স্থানীয় ভিসি ফান্ডগুলো সাধারণত ছোট অংকের বিনিয়োগে সীমাবদ্ধ থাকে, যা বৃহত্তর প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় 'ফলো-অন ফান্ডিং' প্রদানে অক্ষম। এছাড়াও, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত বিদেশি বিনিয়োগ নীতিমালা স্টার্টআপদের জন্য যথেষ্ট নমনীয় নয় এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রস্থান কৌশল (Exit Strategy) সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে। অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী স্থানীয় আইনি জটিলতা, বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং স্থানীয় অংশীদারদের সাথে স্বচ্ছতার অভাবের কারণে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো (ইপিবি) স্টার্টআপ পণ্য ও সেবার আন্তর্জাতিকীকরণে কিছু উদ্যোগ নিলেও, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রবাহকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা এখনো পর্যন্ত সীমিত। এই সমন্বয়হীনতা এবং নীতিগত অস্পষ্টতা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার পথে একটি বড় বাধা, যা দেশের স্টার্টআপগুলোকে তাদের পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে দিচ্ছে না।

বছর মোট স্টার্টআপ বিনিয়োগ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ফলো-অন ফান্ডিং প্রাপ্যতা (%) বিদেশী বিনিয়োগের অংশ (%)
২০১৮ ১২০ ২৫ ৪০
২০১৯ ১৫০ ২২ ৩৮
২০২০ ১১০ ১৮ ৩৫
২০২১ ২০০ ২০ ৪৫
২০২২ ২৫০ ২৩ ৫০

উৎস: ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (VCAB) ও সিপিডি গবেষণা প্রতিবেদন, ২০২৩

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসি কর্তৃক যৌথভাবে ব্যাংক এবং নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি-হ্রাসমূলক প্রণোদনা ও বিনিয়োগ সীমা নির্ধারণ করে একটি নীতিগত নির্দেশনা জারি করা। এটি স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের স্টার্টআপ খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে এবং ফলো-অন ফান্ডিং সংকট নিরসনে সহায়ক হবে।
  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিদেশি বিনিয়োগ নীতিমালায় স্টার্টআপদের জন্য বিশেষ অধ্যায় সংযোজন করা, যেখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রস্থান কৌশল (Exit Strategy) এবং বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করার জন্য সুনির্দিষ্ট বিধান অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এটি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
  • এনবিআর-কে স্টার্টআপ এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডগুলোর জন্য করনীতিতে আরও দীর্ঘমেয়াদী ও আকর্ষণীয় ছাড় প্রদান করতে হবে, বিশেষত বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত মূলধনী লাভের (Capital Gains) উপর করের হার যৌক্তিকীকরণ এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য কর অবকাশ সুবিধা সম্প্রসারণ করা। এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগকে আরও লাভজনক করবে এবং ফলো-অন ফান্ডিং প্রবাহ বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শাহরিয়ার নাফিস

শাহরিয়ার নাফিস 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: স্টার্টআপ ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Inga kommentarer hittades


News Card Generator