বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি: প্লাস্টিক দূষণের চক্র ভাঙার চাবিকাঠি কোথায়?

নাবিলা তাবাসসুম  avatar   
নাবিলা তাবাসসুম
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি: প্লাস্টিক দূষণের চক্র ভাঙার চাবিকাঠি কোথায়?
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি: প্লাস্টিক দূষণের চক্র ভাঙার চাবিকাঠি কোথায়?
ছবি: সংগৃহীত

২০২২ সালে প্রকাশিত পরিবেশ অধিদপ্তরের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় ৩০ হাজার টনের বেশি বর্জ্য উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে প্লাস্টিকের পরিম...

২০২২ সালে প্রকাশিত পরিবেশ অধিদপ্তরের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় ৩০ হাজার টনের বেশি বর্জ্য উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে প্লাস্টিকের পরিমাণ প্রায় ১০-১২ শতাংশ। এই প্লাস্টিক বর্জ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অপরিশোধিত অবস্থায় নদী, খাল ও কৃষি জমিতে মিশে গিয়ে পরিবেশের উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সম্প্রতি, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) যৌথভাবে প্লাস্টিক কণা দ্বারা মাটির উর্বরতা হ্রাসের উপর কয়েকটি গবেষণা পরিচালনা করেছে, যা কৃষি উৎপাদনশীলতার জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, প্লাস্টিক দূষণের চক্র ভাঙতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমির ধারণা কীভাবে একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

প্লাস্টিক দূষণ এখন শুধুমাত্র শহুরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়, এটি কৃষিখাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকিস্বরূপ। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) দীর্ঘদিন ধরে কৃষকদের আধুনিক কৃষি পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন করার কাজ করলেও, প্লাস্টিক মোড়কজাত সার, কীটনাশক এবং কৃষি যন্ত্রাংশের বর্জ্য নিষ্পত্তিতে সুনির্দিষ্ট গাইডলাইনের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষত, কৃষি পণ্য প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা মাঠ পর্যায়ে বর্জ্য হিসেবে জমা হচ্ছে এবং মাটির মাইক্রোবায়াল ইকোসিস্টেমকে ব্যাহত করছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এই বিষয়ে নীতিগত সুপারিশ প্রণয়নের জন্য বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রম শুরু করলেও, মাঠ পর্যায়ে এর প্রয়োগ এখনও সীমিত। সার্কুলার ইকোনমির মূল ভিত্তি হলো 'ব্যবহার করো, মেরামত করো, পুনর্ব্যবহার করো' নীতি, যা প্লাস্টিক বর্জ্যকে শুধু একটি সমস্যা হিসেবে না দেখে একটি মূল্যবান সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করে। এর মাধ্যমে কাঁচামাল হিসেবে নতুন প্লাস্টিক উৎপাদনের চাপ কমানো সম্ভব, যা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কার্বন নিঃসরণ কমাতেও সহায়ক হবে।

প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রচলিত রৈখিক অর্থনীতি (উৎপাদন-ব্যবহার-ফেলে দেওয়া) থেকে সরে এসে সার্কুলার ইকোনমির দিকে ধাবিত হওয়া অপরিহার্য। পরিবেশ মন্ত্রণালয় প্লাস্টিক দূষণ রোধে বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও, তার বাস্তবায়ন এবং সমন্বয় সাধনে আরও দৃঢ় পদক্ষেপ প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ এবং পুনর্ব্যবহারের জন্য একটি শক্তিশালী অবকাঠামো তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে, দেশের অধিকাংশ প্লাস্টিক বর্জ্য অসংগঠিত খাতে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত হয়, যেখানে পরিবেশগত মানদণ্ড প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। সার্কুলার ইকোনমি মডেল শুধুমাত্র বর্জ্য হ্রাস করবে না, বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনেও সহায়ক হবে। প্লাস্টিককে জ্বালানিতে রূপান্তর, প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে রাস্তা নির্মাণ, অথবা কৃষি কাজে ব্যবহারের উপযোগী পণ্য তৈরি — এ সবই সার্কুলার ইকোনমির অংশ। DAE এবং BARI যৌথভাবে কৃষিক্ষেত্রে বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকের ব্যবহার প্রচলনের জন্য পাইলট প্রকল্প শুরু করতে পারে, যা প্লাস্টিক দূষণের উৎস কমাতেও সাহায্য করবে।

প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বর্তমান অবস্থা (২০২২-২৩) শহরাঞ্চলে (টনে) গ্রামীণ অঞ্চলে (টনে) পুনর্ব্যবহার হার (%)
মোট উৎপাদিত প্লাস্টিক বর্জ্য ৩,২০০,০০০ ৮০০,০০০ -
সংগৃহীত প্লাস্টিক বর্জ্য ১,৯২০,০০০ ১০০,০০০ ৫২% (শহর) / ১২.৫% (গ্রাম)
পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক বর্জ্য ৯৫০,০০০ ৫০,০০০ ৩০% (মোট)
পরিবেশে উন্মুক্ত প্লাস্টিক বর্জ্য ১,৬৫০,০০০ ৭৫০,০০০ -

উৎস: পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত তথ্য উপাত্ত।

সুপারিশ

  • পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক 'একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক আইন' এর কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং DAE, BARI ও BRRI-কে সাথে নিয়ে কৃষিক্ষেত্রে প্লাস্টিক মোড়কের বিকল্প হিসেবে বায়োডিগ্রেডেবল ও কম্পোস্টেবল প্যাকেজিং উপকরণের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
  • BARC-এর তত্ত্বাবধানে একটি জাতীয় সার্কুলার ইকোনমি টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে, যার প্রধান কাজ হবে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ ও পুনর্ব্যবহারের জন্য অত্যাধুনিক অবকাঠামো নির্মাণে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পুনর্ব্যবহার শিল্পের জন্য কর অবকাশ ও প্রণোদনা প্রদান নিশ্চিত করা।
  • স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) এবং DAE-কে সমন্বয় করে প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদন এবং কৃষি জমিতে প্লাস্টিক কণা দূষণ রোধে সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ ও কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাবিলা তাবাসসুম

নাবিলা তাবাসসুম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator