নতুন ভ্যাট আইন: ছোট ব্যবসা ও ভোক্তা স্বার্থের টানাপোড়েন

নাসরিন সুলতানা  avatar   
নাসরিন সুলতানা
নতুন ভ্যাট আইন: ছোট ব্যবসা ও ভোক্তা স্বার্থের টানাপোড়েন
নতুন ভ্যাট আইন: ছোট ব্যবসা ও ভোক্তা স্বার্থের টানাপোড়েন
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কর্তৃক প্রস্তাবিত নতুন ভ্যাট আইন সংশোধনী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) এবং ভোক্তাদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ...

সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কর্তৃক প্রস্তাবিত নতুন ভ্যাট আইন সংশোধনী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) এবং ভোক্তাদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি এবং কতিপয় পণ্যে অব্যাহতি প্রত্যাহারের প্রস্তাবনাগুলো বাজারের স্থিতিশীলতা ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার উপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রস্তাবিত বাজেটে স্যানিটারি ন্যাপকিন, বাইসাইকেল এবং বলপেনের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উপর ভ্যাট আরোপ অথবা বিদ্যমান অব্যাহতি প্রত্যাহার করার বিষয়টি ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। অন্যদিকে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য টার্নওভার ভ্যাটের সীমা এবং হার নিয়েও নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত এই খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে, NBR-এর লক্ষ্য রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি হলেও, এর বাস্তবায়ন কৌশল এবং সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

প্রস্তাবিত নতুন ভ্যাট আইনের মূল উদ্দেশ্য NBR-এর রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং ভ্যাট কাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করা। তবে, এই প্রক্রিয়ায় ক্ষুদ্র ব্যবসার উপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা করছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। বর্তমানে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা একটি নির্দিষ্ট টার্নওভার পর্যন্ত ভ্যাট থেকে অব্যাহতি পান অথবা একটি সরলীকৃত টার্নওভার ভ্যাট পরিশোধ করেন। NBR-এর নতুন প্রস্তাবনায় এই টার্নওভারের সীমা হ্রাস করা হতে পারে অথবা ভ্যাটের হার বৃদ্ধি পেতে পারে, যা ছোট দোকান, স্থানীয় উৎপাদনকারী এবং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি প্রভাবিত করবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণের ফলে প্রায় ৭০% ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নতুন করে ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আসবেন, যাদের অধিকাংশই বর্তমানে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির বাইরে। এই অতিরিক্ত ভ্যাটভার ব্যবসার পরিচালনা ব্যয় বাড়িয়ে দেবে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে বাধ্য করবে। এর ফলে, ভোক্তাদের উপর সরাসরি অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হবে, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষেরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অবশ্য এই বিষয়ে NBR-এর সাথে একাধিকবার আলোচনায় বসেছে, যেখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য বিশেষ প্রণোদনা বা ভ্যাট কাঠামো সহজ করার বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে তারা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে পারে।

নতুন ভ্যাট আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উপর থেকে ভ্যাট অব্যাহতি প্রত্যাহার। NBR-এর যুক্তি হলো, এই অব্যাহতিগুলো রাজস্ব ক্ষতি করছে এবং অর্থনীতির একটি বড় অংশকে ভ্যাটের আওতার বাইরে রাখছে। কিন্তু, স্যানিটারি ন্যাপকিন বা বাইসাইকেলের মতো পণ্যের উপর ভ্যাট আরোপের ফলে নারী স্বাস্থ্য ও পরিবেশবান্ধব পরিবহনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণ দেখায় যে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বাইসাইকেলের উপর ভ্যাট আরোপ হলে এর দাম ১৫-২০% বাড়তে পারে, যা সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থা কঠিন করে তুলবে এবং পরিবেশবান্ধব যাতায়াতে নিরুৎসাহিত করবে। Export Promotion Bureau (EPB) এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বাইসাইকেল রপ্তানি খাত সম্প্রতি বেশ ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম বাড়লে স্থানীয় চাহিদা কমে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে এই শিল্পের প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে। একই সাথে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত হস্তশিল্প বা কুটির শিল্পের পণ্যের উপর ভ্যাট আরোপ তাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে, কারণ তাদের উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক বেশি এবং বাজারের প্রতিযোগিতা তীব্র। এই পরিস্থিতিতে, NBR-কে রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রণয়ন করতে হবে।

পণ্যের ধরন বর্তমান ভ্যাট হার (%) প্রস্তাবিত ভ্যাট হার (%) ভোক্তা মূল্যে সম্ভাব্য প্রভাব (%)
স্যানিটারি ন্যাপকিন ০ (নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে) ১৫ ১০-১৫ বৃদ্ধি
বাইসাইকেল (স্থানীয়) ৫ (উৎপাদন পর্যায়ে) ১৫ ১২-১৮ বৃদ্ধি
বলপেন ১৫ ৮-১২ বৃদ্ধি
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর পণ্য (টার্নওভার ভ্যাট) ৪ (সীমা অনুসারে) ৭.৫ (প্রস্তাবিত নতুন সীমা) ৫-১০ বৃদ্ধি

উৎস: NBR প্রস্তাবনা, CPD বিশ্লেষণ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ রিপোর্ট (২০২৩-২৪)

সুপারিশ

  • NBR-কে অবশ্যই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (SME) জন্য টার্নওভার ভ্যাটের সীমা যৌক্তিক পর্যায়ে পুনঃনির্ধারণ করতে হবে এবং বিদ্যমান ভ্যাট আইন, ১৯৯১ এর ধারা ১৫(১) এবং মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এর ধারা ৪৩(৩) অনুযায়ী ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য সরলীকৃত ভ্যাট পদ্ধতি ও অব্যাহতিগুলো পর্যালোচনা করে একটি সহজবোধ্য ও প্রয়োগযোগ্য কাঠামো তৈরি করতে হবে, যাতে তারা আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে সহজে প্রবেশ করতে পারে।
  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC)-এর যৌথ উদ্যোগে একটি প্রভাব মূল্যায়ন কমিটি গঠন করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উপর প্রস্তাবিত ভ্যাট আরোপের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে এবং বিশেষ করে স্যানিটারি ন্যাপকিন ও অন্যান্য জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত পণ্যের উপর ভ্যাট অব্যাহতি বহাল রাখার জন্য মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এর প্রথম তফসিলের ধারা ১২ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট সুপারিশ প্রদান করতে হবে।
  • CPD এবং EPB-এর গবেষণা ও সুপারিশগুলোকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে NBR-কে একটি স্থিতিশীল ভ্যাট নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সহায়ক হবে, তেমনি অন্যদিকে স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষা এবং ভোক্তা স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা পালন করবে, বিশেষত মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এর ধারা ৩২(১) অনুযায়ী পণ্যের মূল্য নির্ধারণে ভ্যাটের প্রভাব নিরীক্ষণের জন্য একটি স্বাধীন মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাসরিন সুলতানা

নাসরিন সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: এনবিআর, ট্যাক্সেশন ও শুল্ক নীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator