সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক স্বাস্থ্য বুলেটিন অনুযায়ী, বাংলাদেশে অসংক্রামক ব্যাধিগুলির মধ্যে ডায়াবেটিসের প্রকোপ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২% কে প্রভাবিত করতে পারে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি মোকাবেলায়, বাংলাদেশ সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে, টেলিমেডিসিন, রিমোট পেশেন্ট মনিটরিং (RPM) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নির্ভর প্ল্যাটফর্মগুলির মাধ্যমে রোগীদের জীবনযাপন ও রোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উদাহরণস্বরূপ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (BSMMU) তাদের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার প্রবর্তন ঘটিয়ে রোগীদের ফলো-আপ এবং ডেটা ট্র্যাকিংয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে একটি আশার আলো দেখাচ্ছে।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার বহুমুখী সুযোগ এনেছে, যা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করছে। কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটরিং (CGM) ডিভাইসগুলি রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রা ২৪ ঘন্টা পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম, যা ঐতিহ্যবাহী ফিঙ্গার-প্রিক পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুল এবং সময়োপযোগী তথ্য সরবরাহ করে। এই ডেটা ব্যবহার করে চিকিৎসকগণ রোগীর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যকলাপ এবং ওষুধের ডোজ সম্পর্কে আরও সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিতে পারেন। এছাড়া, স্মার্ট ইনসুলিন পেন এবং ইনসুলিন পাম্পগুলি রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী ইনসুলিন সরবরাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, যা হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা হাইপারগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি কমায়। মোবাইল অ্যাপস এবং হেলথ পোর্টালগুলি রোগীদের শিক্ষা, খাদ্যাভ্যাস ট্র্যাকিং, ব্যায়ামের রুটিন এবং ওষুধ গ্রহণের সময়সূচী মনে করিয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। World Bank এর অর্থায়নে পরিচালিত ‘হেলথ সেক্টর সাপোর্ট প্রোগ্রাম’ এর আওতায় বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিকে ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ডের ব্যবহার শুরু হয়েছে, যা গ্রামীণ অঞ্চলের রোগীদের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে সহায়ক হচ্ছে এবং ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত পদ্ধতি নিশ্চিত করছে।
তবে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যাপক প্রচলনের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। প্রথমত, এসব প্রযুক্তির উচ্চ মূল্য বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অধিকাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। উন্নত CGM ডিভাইস বা স্মার্ট ইনসুলিন পাম্পগুলির দাম সাধারণ মানুষের জন্য বহন করা কঠিন। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব একটি বড় বাধা। বিশেষ করে গ্রামীণ ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারে অনীহা বা অক্ষমতা দেখা যায়। বাংলাদেশ সরকার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিলেও, স্বাস্থ্য খাতে এর প্রয়োগ এখনও সীমিত। তৃতীয়ত, ডেটা নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা (data privacy and security) একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ। রোগীদের সংবেদনশীল স্বাস্থ্য ডেটা সুরক্ষিত রাখা এবং এর অপব্যবহার রোধ করা অপরিহার্য। যদিও স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে, কিন্তু একটি শক্তিশালী আইনি ও প্রযুক্তিগত কাঠামো এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। এছাড়া, টেলিমেডিসিন এবং রিমোট মনিটরিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিশালী ইন্টারনেট অবকাঠামোর অভাব, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে, প্রযুক্তির পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারকে বাধাগ্রস্ত করছে। ADB (Asian Development Bank) এর সহায়তায় দেশের স্বাস্থ্য খাতে ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে কিছু প্রকল্প চলমান থাকলেও, এর কার্যকারিতা এখনও পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়।
| প্রযুক্তির নাম | প্রচলনের হার (২০২৩) | প্রধান সুবিধা | প্রধান চ্যালেঞ্জ |
|---|---|---|---|
| কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটরিং (CGM) | ২% | ২৪/৭ নির্ভুল গ্লুকোজ ডেটা | উচ্চ মূল্য, সীমিত প্রাপ্যতা |
| স্মার্ট ইনসুলিন পেন/পাম্প | ১% | স্বয়ংক্রিয় ডোজ নিয়ন্ত্রণ | অত্যন্ত উচ্চ মূল্য, রক্ষণাবেক্ষণ |
| টেলিমেডিসিন সেবা | ১৫% | সহজলভ্য পরামর্শ, দূরবর্তী পর্যবেক্ষণ | ইন্টারনেট অবকাঠামো, ডিজিটাল সাক্ষরতা |
| মোবাইল হেলথ অ্যাপস | ১০% | শিক্ষা, ডেটা ট্র্যাকিং, রিমাইন্ডার | ডেটা নির্ভুলতা, ব্যবহারকারীর আগ্রহ |
উৎস: বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (BADAS) এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সমীক্ষা, ২০২৩।
সুপারিশ
- স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে একটি সমন্বিত ডিজিটাল স্বাস্থ্য নীতি (National Digital Health Strategy) প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার জন্য প্রযুক্তির ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং World Bank এর সহায়তায় নিম্ন আয়ের রোগীদের জন্য CGM ও স্মার্ট ইনসুলিন পাম্পের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির উপর ভর্তুকি প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে যৌথভাবে গ্রামীণ ও শহুরে উভয় অঞ্চলের স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের উপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করতে হবে, যাতে তারা রোগীদের এই প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করতে পারে এবং ADB এর প্রযুক্তিগত সহায়তায় ডেটা নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করার জন্য শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা প্রোটোকল ও আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে।
- বাংলাদেশ সরকারকে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেলের মাধ্যমে ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার জন্য উদ্ভাবনী মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন এবং টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্মের উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে, যা স্থানীয় ডেটা এবং ব্যবহারকারীর চাহিদার উপর ভিত্তি করে তৈরি হবে এবং এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী হবে।