সম্প্রতি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, যা গত তিন বছরে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য জারি করা 'স্কলারশিপ লেটার' বা বৃত্তি সংক্রান্ত অফার লেটারগুলির বৈধতা এবং প্রক্রিয়া যাচাই করবে। এই পদক্ষেপটি এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে যখন দেখা যাচ্ছে, বিদেশি শিক্ষার্থীদের নামে ভিসা আবেদনের হার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার পেছনে প্রায়শই প্রকৃত একাডেমিক উদ্দেশ্যের চেয়ে ভিসা বাণিজ্য এবং মানব পাচারের মতো গুরুতর অনিয়ম জড়িয়ে আছে। বিশেষ করে, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ভারত, নেপাল, নাইজেরিয়া ও সোমালিয়াসহ আফ্রিকার কয়েকটি দেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীদের সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ইউজিসির নিজস্ব ডেটাবেইসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং সন্দেহ সৃষ্টি করেছে যে, গ্লোবাল স্কলারশিপের আড়ালে একটি সুসংগঠিত চক্র সক্রিয়।
এই ছায়া অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো কিছু অসাধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং তাদের যোগসাজশে গড়ে ওঠা এজেন্ট চক্র। তারা বিদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে পুঁজি করে জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছে। প্রাথমিকভাবে, আকর্ষণীয় স্কলারশিপ এবং সহজ ভিসা প্রাপ্তির প্রলোভন দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায়, শিক্ষার্থীদের দুর্বল একাডেমিক প্রোফাইল থাকলেও, জাল কাগজপত্র তৈরি করে বা বিদ্যমান নিয়মনীতিকে পাশ কাটিয়ে তাদের ভর্তি দেখানো হয়। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে, যেসব শিক্ষার্থী দেশে আসার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে রিপোর্টও করে না, তাদের নামও ভর্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এটি কেবল আর্থিক প্রতারণাই নয়, দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্কলারশিপের নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ফি'র একটি বড় অংশ অগ্রিম আদায় করছে, যা স্কলারশিপের মূল ধারণার পরিপন্থী।
এই সমস্যাটি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে, উচ্চশিক্ষার পরিবর্তে কারিগরি প্রশিক্ষণের নামেও বিদেশি শিক্ষার্থীদের আনা হচ্ছে, যেখানে মানসম্মত শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের পরিবর্তে ভিসা প্রাপ্তিই মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো) এর তথ্যানুসারে, গত পাঁচ বছরে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও, তাদের মধ্যে যারা নিয়মিত ক্লাস করছে বা ডিগ্রি সম্পন্ন করছে, সেই অনুপাত তুলনামূলকভাবে কম। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধুমাত্র ভর্তির কাগজপত্র তৈরি করে ভিসার মেয়াদ বাড়াচ্ছে এবং পরে অন্য কোনো অবৈধ কার্যক্রমে লিপ্ত হচ্ছে। ফলস্বরূপ, দেশের শ্রমবাজার এবং সামাজিক কাঠামোতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে, যেখানে বিদেশি শিক্ষার্থীরা অবৈধভাবে কাজ করছে বা ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যে অবস্থান করছে। এই প্রবণতা দেশের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর এবং আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
ভিসা বাণিজ্য ও প্রতারণার এই ফাঁদে পড়ে অনেক শিক্ষার্থী তাদের সর্বস্ব হারাচ্ছে। বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য প্রকৃত স্কলারশিপের সুযোগ সীমিত হলেও, এই চক্রগুলো মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের প্রতারিত করছে। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা প্রদান ও নবায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু চক্র ভুয়া অফার লেটার, জাল একাডেমিক রেকর্ড এবং এমনকি জাল আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণপত্র তৈরি করে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করছে। এই প্রক্রিয়ায় জড়িত বিভিন্ন এজেন্সি এবং ব্যক্তিরা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভিসা প্রসেসিং, ভর্তি নিশ্চিতকরণ এবং এমনকি স্কলারশিপ প্রাপ্তির নামে অতিরিক্ত ফি আদায় করছে। যখন শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে পৌঁছায়, তখন তারা আবিষ্কার করে যে তাদের তথাকথিত 'স্কলারশিপ' কেবল নামমাত্র ছিল বা কোনো স্কলারশিপই ছিল না। অনেক সময় তাদের জোর করে নিম্নমানের আবাসন বা অতিরিক্ত ফি দিয়ে কোর্স সম্পন্ন করতে বাধ্য করা হয়, যা তাদের আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সুসংগঠিত অপরাধ চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যা দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে কলুষিত করছে এবং সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
| শিক্ষাবর্ষ | মোট বিদেশি শিক্ষার্থী (ইউজিসি অনুমোদিত) | ভিসা আবেদন (শিক্ষা মন্ত্রণালয় ডেটা) | উচ্চশিক্ষায় নথিভুক্ত (BANBEIS) | কারিগরি শিক্ষায় নথিভুক্ত (কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর) |
|---|---|---|---|---|
| ২০১৮-১৯ | ৬,৭৮০ | ৮,৫৫০ | ৫,৪৫০ | ১,৩০০ |
| ২০১৯-২০ | ৭,২০০ | ৯,১০০ | ৫,৮৫০ | ১,৫০০ |
| ২০২০-২১ | ৬,৯৫০ | ৮,৮০০ | ৫,৭০০ | ১,২০০ |
| ২০২১-২২ | ৮,১০০ | ১১,২০০ | ৬,৭০০ | ১,৪০০ |
| ২০২২-২৩ | ৯,৮৫০ | ১৫,২০০ | ৭,৯০০ | ১,৯৫০ |
উৎস: বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), শিক্ষা মন্ত্রণালয়, BANBEIS, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-এর সম্মিলিত ডেটাবেস।
সুপারিশ
- শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসি-কে অবিলম্বে 'বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি ও স্কলারশিপ নীতিমালা, ২০২৩' (প্রস্তাবিত) চূড়ান্ত করে বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে প্রতিটি বিদেশি শিক্ষার্থীর ভর্তির ক্ষেত্রে একটি কেন্দ্রীভূত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে এবং সকল স্কলারশিপ অফারের বৈধতা ইউজিসি কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে।
- জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-কে তাদের আওতাধীন সকল প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য একটি নির্দিষ্ট 'আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ইউনিট' স্থাপন করতে হবে, যা বাংলাদেশ দূতাবাসগুলির সাথে সমন্বয় করে প্রতিটি শিক্ষার্থীর ব্যাকগ্রাউন্ড এবং আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করবে।
- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়-কে যৌথভাবে একটি টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে, যা বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদন, আগমন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিতির ডেটাবেস তৈরি ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে এবং ভিসা জালিয়াতি বা মানব পাচারের প্রমাণ পাওয়া গেলে 'মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২' এর অধীনে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।