খাদ্য নিরাপত্তা ও পেস্টিসাইড ব্যবস্থাপনা-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ
সাম্প্রতিক সময়ে, দেশের বিভিন্ন স্থানীয় বাজার থেকে সংগৃহীত ফলমূল ও শাকসবজিতে মাত্রাতিরিক্ত পেস্টিসাইড অবশেষের উপস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলি জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষত, ২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিকে ঢাকার কাঁচা বাজার থেকে সংগৃহীত নমুনাগুলির প্রায় ৩০% এ অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি পেস্টিসাইড অবশেষ পাওয়া গেছে, যা সরাসরি জনস্বাস্থ্য এবং খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক অশনি সংকেত। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি কেবল কৃষকের উৎপাদন পদ্ধতি নয়, বরং সামগ্রিক খাদ্য সরবরাহ চেইন এবং ভোক্তা অধিকারের উপর প্রশ্ন তুলেছে।
বাংলাদেশের কৃষিখাত, বিশেষত খাদ্যশস্য উৎপাদনে, উচ্চ ফলন নিশ্চিত করতে রাসায়নিক পেস্টিসাইডের উপর নির্ভরতা ক্রমশ বাড়ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে পেস্টিসাইডের আমদানি ও ব্যবহার উভয়ই গড়ে ৮-১০% হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে অর্গানোফসফেট, পাইরেথ্রয়েড এবং কার্বামেট জাতীয় পেস্টিসাইডগুলির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। ডিএই’র মাঠ পর্যায়ের তথ্যে দেখা যায়, অশিক্ষিত কৃষকদের মধ্যে পেস্টিসাইড ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি, মাত্রা এবং প্রয়োগ পরবর্তী অপেক্ষার সময় (Pre-harvest Interval - PHI) সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব প্রকট। এর ফলস্বরূপ, মাটি, পানি এবং উপকারী পোকামাকড়ের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষি ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য নষ্ট করছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) তাদের গবেষণা কার্যক্রমে এই পেস্টিসাইডগুলির পরিবেশগত প্রভাব এবং কীটপতঙ্গের প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি বারবার তুলে ধরেছে, তবে এই গবেষণালব্ধ জ্ঞান মাঠ পর্যায়ে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা বিদ্যমান। কৃষকদের মধ্যে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) ব্যবহারের বিষয়ে উদাসীনতা তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলছে, যা কৃষি শ্রমিকদের মধ্যে বিভিন্ন চর্মরোগ ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার কারণ হচ্ছে।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (Integrated Pest Management - IPM) এবং রোগ-প্রতিরোধী ফসলের জাত উদ্ভাবনে নিরলস কাজ করে চলেছে। উদাহরণস্বরূপ, BARI বেগুন, টমেটো ও আলুর জন্য একাধিক IPM কৌশল এবং জৈব বালাইনাশক উদ্ভাবন করেছে, যার মধ্যে ফেরোমোন ফাঁদ ব্যবহার করে বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা দমন পদ্ধতি বিশেষভাবে কার্যকর। BRRI বিভিন্ন রোগ ও পোকা-প্রতিরোধী ধানের জাত (যেমন, BRRI ধান৬২, BRRI ধান৭৬) উদ্ভাবন করেছে যা রাসায়নিক পেস্টিসাইডের ব্যবহার কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। তবে, এই উদ্ভাবনগুলির সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এখনও অনেক বাধা রয়েছে। ডিএই'র সম্প্রসারণ কর্মীরা চেষ্টা করলেও, পর্যাপ্ত জনবল, বাজেট এবং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের অভাবের কারণে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিটি কৃষকের কাছে এই আধুনিক পদ্ধতিগুলি পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলস্বরূপ, কৃষকরা দ্রুত ফল লাভের আশায় এবং সহজলভ্যতার কারণে রাসায়নিক পেস্টিসাইডের দিকেই ঝুঁকছেন, যা দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।
| সাল | মোট পেস্টিসাইড ব্যবহার (মেট্রিক টন) | আইপিএম আওতাধীন এলাকা (হেক্টর) | কীটনাশক অবশেষ সহ নমুনা (%) |
|---|---|---|---|
| ২০১৯ | ৪৬,৫০০ | ১,২০,০০০ | ২২% |
| ২০২০ | ৪৯,২০০ | ১,৩০,০০০ | ২৫% |
| ২০২১ | ৫১,৮০০ | ১,৪২,০০০ | ২৮% |
| ২০২২ | ৫৫,১০০ | ১,৫২,০০০ | ৩০% |
উৎস: কৃষি মন্ত্রণালয় (Ministry of Agriculture) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এর বার্ষিক প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) এর বাজার মনিটরিং ডেটা।
সুপারিশ
- কৃষি মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে 'পেস্টিসাইড আইন, ২০১৮' এর ধারা ৭ ও ৮ (পেস্টিসাইড নিবন্ধন ও মান নিয়ন্ত্রণ) কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং ডিএই ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA) কে সমন্বিতভাবে বাজার মনিটরিং ও অনিবন্ধিত পেস্টিসাইড বিক্রির বিরুদ্ধে নিয়মিত ও কঠোর অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একই সাথে, রাসায়নিক পেস্টিসাইডের সর্বোচ্চ অবশেষ সীমা (MRL) সংক্রান্ত বিধিমালাগুলি আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে এবং এর লঙ্ঘনের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে।
- বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর জৈব বালাইনাশক, রোগ-প্রতিরোধী জাত এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM) কৌশল উদ্ভাবন গবেষণায় কৃষি মন্ত্রণালয়কে বাজেট বরাদ্দ কমপক্ষে ৪০% বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি, ডিএইকে এই উদ্ভাবনগুলো কৃষকদের কাছে পৌঁছানোর জন্য প্রতিটি উপজেলায় কমপক্ষে দুইজন করে আইপিএম বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিয়ে নিবিড় হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং প্রদর্শনী খামার স্থাপন জোরদার করতে হবে, যা কৃষকদের মধ্যে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার উৎসাহিত করবে।
- কৃষি মন্ত্রণালয়কে একটি নতুন 'জৈব কৃষি ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নীতি' প্রণয়ন করতে হবে যা কৃষকদের রাসায়নিক পেস্টিসাইড ব্যবহার থেকে জৈব পদ্ধতিতে রূপান্তরে ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং স্থানীয় পর্যায়ে জৈব সার ও বালাইনাশক উৎপাদন ও বিতরণের জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর কারিগরি সহায়তায় উৎসাহিত করার বিধান নিশ্চিত করবে। এই নীতিতে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদকদের জন্য বিশেষ বাজার সুবিধা এবং ব্র্যান্ডিং এর সুযোগ তৈরি করতে হবে, যা ভোক্তাদের মধ্যে নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধি করবে।