ক্ষতিপূরণ তহবিলের জটিলতা: বাংলাদেশের জন্য সমাধান কোথায়? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ক্ষতিপূরণ তহবিলের জটিলতা: বাংলাদেশের জন্য সমাধান কোথায়?

রেজাউন নবী  avatar   
রেজাউন নবী
ক্ষতিপূরণ তহবিলের জটিলতা: বাংলাদেশের জন্য সমাধান কোথায়?
ক্ষতিপূরণ তহবিলের জটিলতা: বাংলাদেশের জন্য সমাধান কোথায়?
ছবি: সংগৃহীত

২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (BCCTF) থেকে মাত্র ৪৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলা...

২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (BCCTF) থেকে মাত্র ৪৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশের চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। অথচ, বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ৬.৮% জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার মধ্যে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। এই প্রেক্ষাপটে, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় উৎস থেকে প্রাপ্ত জলবায়ু অর্থায়নের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং একটি কার্যকর ক্ষতিপূরণ তহবিল ব্যবস্থাপনার জটিলতা বাংলাদেশের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের কৃষি খাত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ শিকার। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি—এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ ফসল উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। উদাহরণস্বরূপ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এর তথ্য অনুযায়ী, বিগত পাঁচ বছরে কেবল আকস্মিক বন্যায় প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন টন ধান উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য হাজার হাজার কোটি টাকা। এই ক্ষয়ক্ষতির জন্য কৃষকদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং তাদের জলবায়ু সহনশীল জাত উৎপাদনে উৎসাহিত করা অত্যন্ত জরুরি। যদিও বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গ্রিন ফান্ড থেকে অর্থায়ন আসে, এর বিতরণ প্রক্রিয়া প্রায়শই দীর্ঘসূত্রিতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পূর্ণ। তহবিল বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে অর্থ পৌঁছাতে না পারা একটি বড় সমস্যা। এছাড়া, জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রশাসনিক ব্যয় এবং অদক্ষ প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ হয়ে যায়, যা মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে।

জলবায়ু অর্থায়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গবেষণা ও উন্নয়ন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাত, খরা সহনশীল ফসল এবং বন্যা প্রতিরোধী প্রযুক্তি উদ্ভাবনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। তবে, এই গবেষণাগুলোকে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের কাছে পৌঁছাতে এবং বৃহৎ পরিসরে প্রয়োগ করতে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর মাধ্যমে এই গবেষণাগুলো সমন্বয় করা হলেও, প্রায়শই দেখা যায় যে উদ্ভাবিত প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণ এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনী আয়োজনে কাঙ্ক্ষিত গতি আসে না। আন্তর্জাতিক গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (GCF) এবং অভিযোজন তহবিল (Adaptation Fund) থেকে বাংলাদেশ অর্থায়ন পেলেও, এই তহবিলগুলোর অ্যাক্রিডিটেশন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। পরিবেশ মন্ত্রণালয় এই তহবিলগুলো পেতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করলেও, প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি, কারিগরি সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়নে আরও দক্ষতা প্রয়োজন। অনেক সময়, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর নিজস্ব শর্তাবলী এবং অগ্রাধিকারের কারণে বাংলাদেশের স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে, যা ক্ষতিপূরণ তহবিলের উদ্দেশ্যকে আংশিকভাবে ব্যর্থ করে দেয়।

অর্থায়ন উৎস ২০১৮-১৯ (কোটি টাকা) ২০১৯-২০ (কোটি টাকা) ২০২০-২১ (কোটি টাকা) ২০২১-২২ (কোটি টাকা) ২০২২-২৩ (কোটি টাকা)
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (BCCTF) ৩৫০ ৪০০ ৪৫০ ৪৫০ ৪৫০
আন্তর্জাতিক গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (GCF) থেকে প্রাপ্তি (আনুমানিক) ৬০ ৭০ ৮৫ ১০০ ১১০
অভিযোজন তহবিল (Adaptation Fund) থেকে প্রাপ্তি (আনুমানিক) ১৫ ২০ ২৫ ৩০ ৩৫

উৎস: অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন দাতা সংস্থার প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • জলবায়ু পরিবর্তন জনিত ক্ষতিপূরণ তহবিলের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে 'বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট আইন, ২০১০' এর অধীনে একটি স্বাধীন নিরীক্ষা কমিটি গঠন করা হোক, যা তহবিলের বিতরণ ও প্রকল্প বাস্তবায়নের নিয়মিত তদারকি করবে এবং এর প্রতিবেদন পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক জনসম্মুখে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক হবে।
  • কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণে অর্থায়নের জন্য একটি নির্দিষ্ট অনুপাত বরাদ্দ করে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর মাধ্যমে BRRI ও BARI-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে জলবায়ু সহনশীল ফসল ও প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং DAE এর মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে এর দ্রুত প্রসারে সহায়তা করা হোক।
  • আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল যেমন GCF এবং Adaptation Fund থেকে অর্থায়ন প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ করতে পরিবেশ মন্ত্রণালয়-কে কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দক্ষ প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরির জন্য একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করতে হবে, যা আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় করে বাংলাদেশের স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী প্রকল্প প্রণয়নে সহায়তা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রেজাউন নবী

রেজাউন নবী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জলবায়ু অর্থায়ন ও গ্রিন ফান্ড। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator