এন্টিবায়োটিকের অপব্যবহার: জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের নীরব পদধ্বনি ও প্রতিরোধের চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

এন্টিবায়োটিকের অপব্যবহার: জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের নীরব পদধ্বনি ও প্রতিরোধের চ্যালেঞ্জ

ডা. আসিফ মাহমুদ  avatar   
ডা. আসিফ মাহমুদ
এন্টিবায়োটিকের অপব্যবহার: জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের নীরব পদধ্বনি ও প্রতিরোধের চ্যালেঞ্জ
এন্টিবায়োটিকের অপব্যবহার: জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের নীরব পদধ্বনি ও প্রতিরোধের চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, বাংলাদেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বা অ্যান্টিবায়োটিকের কার...

সম্প্রতি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, বাংলাদেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বা অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হারানোর হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে, তৃতীয় প্রজন্মের সেফালোস্পোরিন এবং ফ্লুরোকুইনোলোন-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকগুলোর বিরুদ্ধে বহু-ঔষধ প্রতিরোধী (MDR) ব্যাকটেরিয়ার উত্থান জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক হুমকি তৈরি করেছে। এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু হাসপাতালে ই. কোলাই (E. coli) এবং ক্লেবসিয়েলা (Klebsiella) ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে সেফালোস্পোরিনের প্রতি রেজিস্ট্যান্সের হার ৭০-৮০% ছাড়িয়ে গেছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক নির্ধারিত সহনশীলতার মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। এই পরিসংখ্যানে স্পষ্ট যে, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারের কারণে আমরা এক নীরব জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি, যা প্রতিরোধে জরুরি ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য।

অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারের মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো চিকিৎসকদের অপ্রয়োজনীয় বা ভুল অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশন এবং রোগীদের অসম্পূর্ণ কোর্স গ্রহণ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, সাধারণ সর্দি-কাশি বা ভাইরাল ইনফেকশনের মতো রোগেও অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিক কোনো কার্যকারিতা রাখে না। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এর নজরদারির দুর্বলতার কারণে ফার্মেসিগুলোতে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এছাড়া, কৃষিক্ষেত্রে এবং পশুপালনে অ্যান্টিবায়োটিকের নির্বিচার ব্যবহারও মানুষের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত। পোল্ট্রি ও মৎস্য খামারে রোগ প্রতিরোধের জন্য বা দ্রুত ওজন বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়, যা খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এবং অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হ্রাস করে। ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে অর্ধেকেরও বেশি অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করা হয় ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার ফলাফল আসার আগেই, যা ভুল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ায়। এই প্রথাগত পদ্ধতির পরিবর্তন না হলে রেজিস্ট্যান্সের বিরুদ্ধে লড়াই করা কঠিন হবে।

এই নীরব জনস্বাস্থ্য সংকটের আরেকটি গভীর দিক হলো জনসচেতনতার অভাব। সাধারণ মানুষ প্রায়শই অ্যান্টিবায়োটিককে সাধারণ জ্বরের ঔষধ মনে করে এবং কোর্স সম্পন্ন না করেই ভালো বোধ করলে ঔষধ খাওয়া বন্ধ করে দেয়। এতে ব্যাকটেরিয়া সম্পূর্ণরূপে নির্মূল না হয়ে বরং আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং পরবর্তী সময়ে একই অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) যদিও সরাসরি অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নিয়ে কাজ করে না, তবে জনস্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে তাদের অভিজ্ঞতা এবং কৌশল ব্যবহার করা যেতে পারে, কারণ স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ভুল ধারণা দূর করতে মানসিক স্বাস্থ্যের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দিতে হয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) বিভিন্ন সময়ে অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার নিয়ে নির্দেশনা জারি করলেও, মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন এবং কার্যকর তদারকি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে সাধারণ ইনফেকশনও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে, যা চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি করে এবং মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়। বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে মারা যায়, এবং এই সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে ভবিষ্যতে আমরা এমন এক পরিস্থিতিতে পড়তে পারি যেখানে সাধারণ কোনো কাটাছেঁড়া বা ছোটখাটো অপারেশনের জন্যও কোনো কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক অবশিষ্ট থাকবে না, যা আধুনিক চিকিৎসার ভিত্তিকে ধসিয়ে দেবে।

অ্যান্টিবায়োটিক রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া রেজিস্ট্যান্সের হার (২০২৩) ২০১৮ সালের তুলনায় বৃদ্ধি
সেফট্রিয়াক্সোন ই. কোলাই ৭২% ১৫%
সিপ্রোফ্লক্সাসিন ক্লেবসিয়েলা নিউমোনি ৬৫% ১২%
এজিথ্রোমাইসিন স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস ৪৫% ৮%
অ্যামোক্সিসিলিন সালমোনেলা টাইফি ৮০% ২০%

উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) ও আইইডিসিআর (IEDCR) এর যৌথ প্রতিবেদন, ২০২৩।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক প্রণীত "জাতীয় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স কন্টেনমেন্ট স্ট্র্যাটেজি" এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) কে ফার্মেসিগুলোতে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধে কঠোর মনিটরিং এবং আইন প্রয়োগের জন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হবে এবং প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিলসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
  • চিকিৎসকদের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশনের গাইডলাইন (যেমন: ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার ফলাফল আসার আগে ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার সীমিত করা) বাধ্যতামূলক করতে হবে। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) এর মাধ্যমে চিকিৎসকদের জন্য অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) ব্যবস্থাপনার উপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করতে হবে।
  • জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) এর তত্ত্বাবধানে ব্যাপক প্রচার অভিযান চালাতে হবে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর সহযোগিতায় ভুল ধারণা ও সামাজিক চাপ থেকে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার রোধে আচরণগত পরিবর্তনের উপর গুরুত্বারোপ করে গণমাধ্যম, স্কুল-কলেজ এবং কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. আসিফ মাহমুদ

ডা. আসিফ মাহমুদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জনস্বাস্থ্য ও মহামারী প্রতিরোধ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator